15/02/2026
লিখলেন Babita Saha............................................ গত প্রায় এক বছর ধরে পরিকল্পনার পর অবশেষে আমরা সাতজন সহকর্মী ঘুরে এলাম ঝাড়গ্রাম জেলার অন্তর্গত আমলাশোল এর কোজাগর হোমস্টে থেকে।
বেশ কিছুদিন যাবৎ ফেসবুক এবং একটি প্রদর্শনীতে কোজাগরের ছবি দেখার পর কোজাগর যেন আমাদের সবাইকে টানছিল।
খড়গপুর অব্দি ট্রেনে গিয়ে আমরা একটি গাড়ি করে আমলাশোলের পথে রওনা দিলাম। খড়গপুর ছাড়িয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর থেকেই পথের দু'ধারের সবুজ সৌন্দর্য্য মন একেবারে ভরিয়ে দিল। পুরো পথ জুড়েই কখনো সবুজ ধানের ক্ষেত,কখনো ঘনশালের জঙ্গল, দূরে ছোট বড় পাহাড়,আর তারই মাঝে মাঝে গ্রাম্য জীবনের ছবি ফুটে উঠতে লাগলো।
এই সৌন্দর্য্য অতিক্রম করার পর আরও এক সৌন্দর্য্য আমাদের জন্য অপেক্ষা করেছিল সেটা হলো কোজাগর।
চারিদিকে ছোট বড় পাহাড়, ঘনশালের জঙ্গল, পাকা ধানে ভরা ক্ষেত। তারি মাঝখানে বিরাজ করছে কোজাগর। সবুজ গালিচার মত আঙিনাকে ঘিরে কোজাগরের খাওয়ার জায়গা, থাকার জায়গা এবং কয়েকটি টেন্ট। কোজাগর থেকে বেরোলে যেদিকেই যাওয়া যাবে সেদিকেই সুন্দর সাজানো ছবির মত গ্রাম।
কোজাগরের সকাল দুপুর বিকেল রাত সব বেলাই যেন আলাদা আলাদা সৌন্দর্য্য নিয়ে আমাদের চোখে ধরা দিল। খুব ভোরে শিশির ভেজা ঘাস, মোরগের ডাক। বেলা বাড়লে আশেপাশের গ্রামের দৈনন্দিন কাজের শুরু, গরু -ছাগল- হাঁস- মুরগির খোয়ার থেকে বেরিয়ে চড়তে যাওয়া, দরিদ্র শিশুদের নগ্ন পায়ে বই বগলে পড়তে যাওয়া, খেজুর রস এ জ্বাল দেওয়া ইত্যাদি কত কিছুই না দেখলাম। গ্রামের প্রতিটি বাঁক এবং প্রতিটি মানুষই যেন ছবির বিষয়বস্তু। কোনায় কোনায় সৌন্দর্য্য।
কোজাগরে আমরা দুটো দিন ছিলাম। সেই দুটো দিনে যে কি নির্ভেজাল আনন্দ লাভ করেছি তা বলবার নয়। আমরা নিজেরা সাত জন।তার সাথে আমরা আনন্দের ভাগীদার হিসেবে পেয়েছিলাম কোজাগরেরই অন্যতম দুই কর্ণধার সন্দীপন ও পার্থকে ( স্নিগ্ধা তো সঙ্গেই ছিল )। এর সাথে উপরি পাওনা ছিল মহুল,মাদল আর মিষ্টু। এই তিনজন বিশেষ করে মাদল থাকার জন্য কোজাগরের সবুজ মাঠে সারাদিন ছিল অনেক তারাপদ আর রাজুর অবিরাম আনাগোনা ( সকলের নাম মনে রাখতে পারিনি ) তাদের প্রাণোচ্ছল খেলাধুলা, ঝগড়া বিবাদ,মান অভিমান দেখে নিজেরাও যেন শৈশবে ফিরে গিয়েছিলাম। গ্রামে কোন নেটওয়ার্ক না থাকার জন্য বাচ্চাদের মধ্যে প্রকৃত শৈশব এবং গ্রামের মানুষদের মধ্যে অসীম সরলতা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। এরকম গ্রামে এলে বোঝা যায় যে শহুরে বাচ্চাদের শৈশব মোবাইল কিভাবে কেড়ে নিয়েছে।খালি গায়ে, খালি পায়ে বাচ্চা গুলোর প্রাণে যে কি আনন্দ। কি যে ছবি তোলার সময় টুকু ছাড়া নিজেরাও দুদিন মোবাইল থেকে মুক্তি পেলাম।
দুদিন ধরে ঘুরে বেড়িয়ে গ্রামের মানুষদের সাথে আলাপচারিতায় মনটা বড় ভালো হয়ে গেল। কত সহজ-সরল মানুষ।
এখানে যাদের কথা না বললেই নয় তাদের একজন হলেন কোজাগরের মামা, যিনি ওই গ্রামের লোক না হয়েও গ্রামের মানুষদের সাথে নিজেকে একাত্ম করে ফেলেছেন। সব দিকেই তার নজর।আবার রেঁধে বেড়ে খাওয়ানোতেও তিনি পটু। মামারই সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সুমিত্রা আর মথুর। রান্না বান্না যত্নআত্তি আর এখানকার বিশেষ একটি পদ পাতা পোড়া চিকেন বানাতেও এরা সিদ্ধ হস্ত। এই পাতা পোড়া চিকেন বানানোর ব্যাপারটাও এখানকার সন্ধ্যা কে অন্যরকম মাত্রা দেয়।
এরপর আসি কোজাগরের রাতের কথায়। অনেক রাতে চাঁদের আলোয় ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গিয়ে এক পুকুর পাড়ে বসে সন্দীপন আর মহলের গান শোনার অভিজ্ঞতাও অনন্য। চাঁদের আলোয় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে মনে পড়ল বুদ্ধদেবে গুহর সেই উপন্যাসের কথা, বন জ্যোৎস্না য় সবুজ অন্ধকার ।আমাদের বেড়ানোর এটা একটা বিশেষ পাওনা।
কোজাগর এবং আশেপাশের গ্রামে ঘোরাঘুরি করতে করতে এবং মানুষগুলিকে দেখে খুব অরণ্যের দিনরাত্রি সিনেমাটার কথা মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল শহুরে সভ্যতা থেকে দূরে সেই পালামৌ এর জঙ্গলেই আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিছু কিছু মহিলাকে দেখে মনে হচ্ছিল অরন্যের দিন-রাত্রি র সেই ডুলির কথা।
আবার রাতে খাওয়া দাওয়ার পর রাত জেগে চাঁদের আলোয় মাঠে বসে স্নিগ্ধা সন্দীপন আর পার্থ র গান কোজাগর নামটিকে যথার্থ করে তুলেছিল।আকাশে চাঁদ থাকলে রাত এখানে জাগতেই হবে। নাহলে যে এখানে আসাটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। নামটাই তো রাত জাগার কথা বলে দেয়।
দুদিন কোজাগরের গ্রাম্য জীবন যেন আমাদের অনেকদিনের প্রানশক্তির যোগান দিলো। কর্মব্যস্ত শহুরে জটিলতা থেকে দূরের এই গ্রাম্য জীবন আমাদের অনেক কিছু দিলো। বুদ্ধদেব গুহর কথা ধার করেই বলতে হয়, নির্জনতা কখনো কাউকে খালি হাতে ফেরায় না।
আবার যাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।প্রানশক্তি ফুরিয়ে এলেই আবার দলবেঁধে চলো কোজাগর।