31/03/2025
জলদাপাড়ায় যেসব পর্যটক হাতি রাইড করতে আসছেন, তাঁরা একরকম ‘বাবু কালচার’-এর শিকার হচ্ছেন। টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ালেও হাতির পিঠে চাপার মওকা পাচ্ছেন না তারা। টিকিট নিয়ে আলিপুরদুয়ারের জলদাপাড়ায় যে অনিয়ম শুরু হয়েছে, তাকেই স্থানীয় নীচুতলার বনকর্মীরা বলছেন, বাবু কালচার। কারণ, টিকিট নিয়ে কালোবাজারির ভিত্তিটাই হল যাঁরা লাইনে না দাঁড়িয়ে বাবুর মতো ঘরে বসে সাফারির টিকিট পেতে চান, তাঁদের ‘পরিষেবা’ দেওয়া। সেজন্যই এই দালালরাজ চলছে। এর সঙ্গে বনকর্মীদের একাংশের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে।
অনলাইনে টিকিট বুকিং গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কেন বন্ধ, কেউ জানে না। অভিযোগ, তারপর থেকেই জলদাপাড়ায় এলিফ্যান্ট রাইড ও কার সাফারির টিকিট বুকিংয়ের জন্য এই ‘বাবু কালচার’ চালু হয়ে গিয়েছে। বাবুদের কাছে টিকিট পৌঁছে দিচ্ছে দালালরাই। সেই পর্যটকদের আর জলদাপাড়ার টিকিট কাউন্টারে টিকিটের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে না। আর যেহেতু হাতি সাফারির টিকিটের সংখ্যা নির্দিষ্ট, তাই দালালরা টিকিট আগেভাগেই সরিয়ে রাখলে, অনেকেই যে লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট না পেয়ে হতাশ হবেন, বলাই বাহুল্য। যদিও নিয়ম হল, যতগুলি টিকিট থাকবে, ততজনই লাইনে দাঁড়াবেন। তাহলে তো লাইনের প্রত্যেকেরই টিকিট পাওয়ার কথা ছিল। তাঁরা পাচ্ছেন না কেন?
জলদাপাড়ায় এই রাইডের জন্য ৬টি হাতি থাকার কথা। তবে বাস্তবে প্রতি ৩-৪টি হাতিকেই এই কাজে লাগানো হয়। বৃহস্পতিবার বাদে প্রতিদিন সকালে তিনটি ট্রিপ হয়। একেকটি হাতির পিঠে ৪ জন চাপেন। চারটি হাতি থাকলে এক ট্রিপে ১৬ জন ও তিনটি ট্রিপে ৪৮ জন রাইড করতে পারার কথা। এবার এই টিকিটের মধ্যে কয়েকটি সরিয়ে রাখার কথা ভিআইপি কেউ রাইড করতে চাইলে, তবেই। এই ভিআইপিদের টিকিট নিয়েই নাকি কালোবাজারি চলছে। ভিআইপিদের নাম করে সরিয়ে রাখা টিকিট দেড় গুণ, দু’গুণ দামে সাধারণ পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে দালালরা। আর টিকিট কাউন্টার থেকে বলে দেওয়া হচ্ছে, ভিআইপিদের জন্য এক বা দুটি হাতিকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। তাই টিকিট শেষ।
মাদারিহাটের পর্যটন ব্যবসায়ী সঞ্জয় দাস, বিশ্বজিৎ সাহা-রা অভিযোগ করেছেন, অনলাইনে টিকিট বুকিং বন্ধ হতেই নাকি এই দালালরাজ বেশি করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যদিও জলদাপাড়া প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের রেঞ্জ অফিসার মণীন্দ্র মহন্ত অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ‘বন দপ্তরের কাউন্টার থেকে নিয়ম মেনেই সব টিকিট দেওয়া হচ্ছে। ভিত্তিহীন অভিযোগ করা হয়েছে।’ তবে অনলাইনে টিকিট বুকিংয়ের নিয়ম আবার চালু করার দাবি করেছেন তিনিও।
দিল্লি থেকে জলদাপাড়ায় এসেছিলেন শুভাশিস মহাপাত্র। টিকিট না পাওয়ার হতাশা থেকেই বললেন, ‘জলদাপাড়া থেকে খুব খারাপ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলাম। এখানকার থেকে কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যানের ব্যবস্থাপনা অনেক ভালো।’ একই কথা শিলিগুড়ির জয়দীপ লাহিড়ির মুখেও। বললেন, ‘সব জায়গায় অফলাইন থেকে অনলাইন হচ্ছে। আর জলদাপাড়ায় কেন অনলাইন থেকে ব্যবস্থাটা অফলাইন হয়ে গেল? ভাবতেই অবাক লাগছে।’ স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের কথায়, আগে ভিআইপিরা সচরাচর এসে উঠতেন হলং বনবাংলোয়। সেই বাংলোয় যাঁরা রাত্রিবাস করতেন, তাঁদের জন্য হাতি সাফারির টিকিট রেখে, বাকি টিকিট অন্য পর্যটকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হত। এখন তো হলং বনবাংলো আর নেই। তাই ভিআইপিরা কোথায় থাকছেন, আদৌ কেউ এসেছেন কি না, কেউ বুঝতেই পারছে না। সৌজন্য: Uttarbanga Sambad