20/11/2025
মানালির স্বাদের সফর — এক ভ্রমণ গল্প
আমরা ২০২১ সালে মানালি ঘুরতে গিয়েছিলাম। আসল উদ্দেশ্য ছিল "সার পাস " ট্রেকিং তবে যাবার পথে আমরা ২ দিন মতো মানালীতে ছিলাম। দারুন সুন্দর জায়গা এই মানালী। মানালি মানেই বরফ, পাহাড়, নদীর স্রোত—আর তার থেকেও বড় কথা, পথের ধারে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ সব স্ট্রিট ফুড। এই প্ৰবন্ধে আমি ঠিক সেরকমই কিছু খাবারের সন্ধান দেব , যেগুলোর ইতিহাস, স্বাদ ও ঐতিহ্য মানালিকে আরও মোহময়ী করে তুলবে ।
১) সিদ্ধু — কাঠের আগুনে পাহাড়ি স্বাদ
( দাম ১৫০ টাকা পার প্লেট )
যেদিন পৌছুলাম সেদিন সন্ধ্যাবেলাতে ইতিউতি ঘুরতে ঘুরতে বাঙালি পিঠের মতো দেখতে এই অদ্ভূৎ খাবারটা দেখতে পেলাম। একটা কিনে আমি আর সপ্তপর্ণী ভাগ করে খেলাম। শীতের সন্ধ্যায় গরম গরম সিদ্ধু ঝাল ঝাল চাটনী দিয়ে খেতে মন্দ লাগলো না। তবে এত বড়ো জিনিস একা খাওয়া খুব মুশকিল। সবথেকে বড়ো কথা এটা খাবার পর আর আমাদের রাতের খাবার লাগে নি।
এটি মূলত হিমাচলের ঐতিহ্যবাহী রুটি, যা গমের ময়দা দিয়ে বানানো হয় এবং ভেতরে থাকে আখরোট, তিল, পোস্তদানা, কিংবা পালং শাকের স্টাফিং।
সিদ্ধুর ইতিহাস খুব পুরোনো—একসময় কঠিন ঠান্ডায় শক্তি ধরে রাখতে পাহাড়ি মানুষরা এই কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ খাবার খেতেন। কাঠের চুলায় ধীরে ধীরে সিদ্ধু ফুলে ওঠে এবং ঘি মাখানো গরম অবস্থায় এর স্বাদ অতুলনীয়।
এটি শুধু খাবার নয়, পাহাড়ি মানুষের জীবনধারার প্রতীক ও বটে।
2)ট্রাউট ফিশ — বিয়াস নদীর উপহার
( দাম ২৫০-৫০০ টাকা পার প্লেট )
মানালিতে পৌঁছে আমি প্রথম সপ্তপর্ণীর কাছে জানতে চাইলাম - এই নদীতে আবার মাছ পাওয়া যায় নাকি ? ও বললো তা আবার যায় না। এই সব জায়গা ট্রাউট ফিশ এর জন্য বিখ্যাত। বাঙালি বলে কথা মাছ ছাড়া থাকা যায় অতএব এ মাছ আমায় খেতেই হবে। সুতরাং খোঁজ শুরু হলো। মোনেস্ট্রির কাছে অনেকগুলো ননভেজ দোকান পেলাম। তারই একটাতে ঢুকে পড়লাম। টাটকা মাছ গ্রিল করে ১০ মিনিটের মধ্যে চাটনি সহযোগে প্লেট এ হাজির হলো। দারুন খেতে। মাঝে শুধু একটা কাঁটা। অনেকটা ভেটকীর মতো স্বাদ। ওদের কাছে শুনলাম এই সব পাহাড়ী মাছ নাকি আজকাল ফার্মিংও হচ্ছে।বিয়াস নদীতে বিশেষভাবে চাষ করা হয় এই ট্রাউট মাছ .
ব্রিটিশ আমলে হিমাচলে ট্রাউট চাষ শুরু হয় এবং তখন থেকেই এটি পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। মানালির খাবারের তালিকায় ট্রাউট যেন ‘স্টার ডিশ’।
এই খাবারের বিশেষত্ব হলো—মাছটিকে অতিরিক্ত মশলা নয়, লেবু, বাটার, কালো মরিচ ও পাহাড়ি হার্ব দিয়ে হালকা গ্রিল করা হয়। এতে মাছের প্রকৃত স্বাদ বেরিয়ে আসে।
3)লাফিং — ঠান্ডার মাঝে টক-ঝালের লাজবাব স্বাদ
( দাম ১০০ টাকা পার প্লেট )
তিব্বতি লাফিং মানালির গলিতে গলিতে মেলে। লাফিং মূলত মুগডাল বা তিসির জেলির মতো একটা রোল, যাকে পাতলা করে কেটে তাতে ঝাল-টক চিলি সস, সয়া সস আর ভিনেগার মেশানো হয়।
এর ইতিহাস তিব্বতি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কাছ থেকে এসেছে, যারা উপবাসের সময় সহজপাচ্য এই খাবার খেতেন।
ঠান্ডার মাঝে এর ঝাঁঝালো স্বাদ শরীরে একদম উষ্ণতা এনে দেয়!
4) জিলেপি — পাহাড়ি সকালে গরম গরম মিষ্টি
( ২০ টাকা পিস )
মানালির বাজারে সকালে গেলে গরম-গরম জিলেপি ভাজার দৃশ্য চোখে পড়বেই। ময়দা ও টক দইয়ের ফারমেন্টেড ব্যাটার দিয়ে তৈরি এই গোল পাকানো মিষ্টির ইতিহাস ভারতীয় শাসকদের আমল থেকেই চলে আসছে।
পাহাড়ি দোকানদারেরা আজও তামার কড়াইয়ে ঘি বা তেলে জিলেপি ভেজে সুগন্ধ ছড়িয়ে দেন।
5) ছোট গোল গুলাবজাম — নরম, গরম, স্বর্গীয়
( দাম ৩০ টাকা পার প্লেট। ১০ পিস মতো থাকে। )
মানালিতে “মিনি গুলাবজামুন” খুব বিখ্যাত। ছানার বদলে এটি অনেক সময় খোয়া দিয়ে তৈরি করা হয়, ফলে মিষ্টিটা আরও নরম ও স্যাঁতস্যাঁতে হয়।
গোল করে ভেজে গরম চিনির রসে ডুবিয়ে শালপাতার পাত্রে গরম গরম পরিবেশন করা হয়। এর উৎপত্তি মূলত পারস্য থেকে, পরে মুঘল আমলে ভারতীয় রূপ পায়।
মানালির ঠান্ডায় গরম গুলাবজাম খেলে মনে হয় আনন্দ যেন জিভ থেকে সোজা মনে ঢুকে যাচ্ছে।
6) দই চাট — টক-মিষ্টি ক্রাঞ্চের মেলবন্ধন
( ১৫০ টাকা / প্লেট। একটু বেশী দাম। এই বস্তুতটা না খেলে কোনো
মহাভারত অশুদ্ধ হবে বলে আমার মনে হয় না। )
মানালির স্ট্রিট ফুডে দই চাট অপরিহার্য। এখানে আলু, চনা, পেঁয়াজ, ধনেপাতা, দই, ইমলি চাটনি আর ভুজিয়া একদম পারফেক্টভাবে মেশানো হয়।উত্তর ভারতের চাট সংস্কৃতি থেকে এটির জন্ম।
ভ্রমণ ক্লান্তি কাটাতে এক বাটি ঠান্ডা দই চাট হলো একদম চমৎকার রিফ্রেশমেন্ট।
ধাম — হিমাচলের ঐতিহ্যের থালি
(৩৫০ টাকা। আমরা এই খাবারটি হিমাচল ডেভলপমেন্ট অথোরিটির রেস্তুরাঁ থেকে খেয়েছিলাম। বাজারে আরো কম দামে এটি পাওয়া যায়। )
ধাম—হিমাচলির পূর্ণ ঐতিহ্যবাহী ভোজ। এই খাবারের ইতিহাস ১০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। রাজাদের বিয়ে বা পুজোর সময় ‘বোটিই’ নামে ব্রাহ্মণ রান্নাবিদরা বিশেষ ভোজ রান্না করতেন, সেখান থেকেই ধামের উৎপত্তি।
ধামে থাকে—
• রাজমা
• চনা মদরা
• তিল ও দইয়ের ভাজি
• রাইস
• সবজি
সব খাবারই ঘি, দই, স্থানীয় মসলা ও পাহাড়ি চালের সঙ্গে তৈরি হয়।
এককথায় ধাম হলো হিমাচলের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার প্রতীক।
কাসোল গুরুদোয়ারার লঙ্গর — নিরাময়ের স্বাদ, সমতার বার্তা
মানালি থেকে কাসোল যাওয়ার পথে গুরুদোয়ারা সাহিব। পাহাড়ের মাঝে এত শান্ত, এত পবিত্র পরিবেশে বসে লঙ্গর খাওয়া সত্যিই আলাদা অভিজ্ঞতা।
গুরুদোয়ারার লঙ্গর শতাব্দীপুরোনো শিখ ঐতিহ্যের অংশ—যেখানে জাত, ধর্ম, অর্থ কোনও ভেদাভেদ নেই। সবাই একই সঙ্গে বসে খায়, সবাইকে একই রকম খাবার পরিবেশন করা হয়।
লঙ্গরের খাবার সাধারণ হলেও তার স্বাদ অসাধারণ—
• গরম রুটি
• ডাল
• সবজি
• রাইস
• আর শেষে মিষ্টি গুর
এই খাবারের বিশেষত্ব হলো—এটি ভালোবাসা, সেবাশ্রদ্ধা এবং সমতার আদর্শ নিয়ে রান্না হয়।
গুরুদোয়ারার স্বেচ্ছাসেবকরা (সেওয়াদার) নিজের হাতে তৈরি করেন প্রতিটি পদ। পাহাড়ি জলের স্বচ্ছতা আর মানুষের মন থেকে দেওয়া সেবার ফলে খাবারের স্বাদ যেন আরও পবিত্র হয়ে ওঠে।
কাসোল গুরুদোয়ারার লঙ্গর যাত্রার শেষে আমার মনে একটাই কথা—
“এটা শুধু খাবার নয়, এটা আত্মার শান্তি।”
________________________________________
মানালির মালাই দুধ ও স্থানীয় মিষ্টির গল্প —
পাহাড়ি সন্ধ্যার স্বাদ , মানালির ঠান্ডা সন্ধ্যা, রাস্তায় হালকা কুয়াশা, আর মল রোডের দোকানগুলোর সামনে ধোঁয়া ওঠা কড়াই—এই পরিবেশেই জন্ম নেয় এক অনন্য স্বাদ—মানালির মালাই দুধ। মিষ্টি, ঘন, উষ্ণ এই দুধ মানালির পথচলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মানালির মালাই দুধ এমনই বিখ্যাত যে সন্ধ্যার পরপরই দোকানগুলোর সামনে লাইন পড়ে যায়। বড় কড়াইয়ে দুধ দীর্ঘক্ষণ ধরে জ্বাল দেওয়া হয়, যতক্ষণ না তা ঘন হয়ে উঠে আসা মালাইয়ে ভরে ওঠে।
কিভাবে তৈরি হয়?
• প্রথমে খাঁটি গরুর দুধ ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্লো ফ্লেমে ফুটানো হয়।
• ওপরে জমতে থাকা মালাই বারবার আলাদা করে রাখা হয়।
• শেষে এলাচ, জাফরান ও অল্প পরিমাণ চিনি বা গুড় মেশানো হয়।
• গরম দুধ ঢালা হয় মাটির ভাঁড়ে, তার ওপরে ভাসানো হয় মোটা মালাইয়ের স্তর।
শীতল পরিবেশে এই গরম মালাই দুধ খাওয়ার আনন্দই আলাদা—হাত গরম হয়, মন গরম হয়, আর শরীরে যেন নতুন এনার্জি ফিরে আসে।
আপনি যদি মানালি যাবার কথা ভাবেন তবে এই খাবারগুলো অবশ্যই চেখে দেখতে ভুলবেন না। শেষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে গুরুদ্বোযারা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ছবিতে যে ব্রিজটা দেখছেন তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন ব্রিজ তৈরি হয়েছে। হিমালয় নিয়ে মানুষ যে ছেলেখেলা শুরু করেছে তার শাস্তির হাত থেকে ঈশ্বর ও রক্ষা পাচ্ছেন না।
কলকাতা থেকে মানালি—কিভাবে যাবেন ?
মানালি হিমাচল প্রদেশের একটি জনপ্রিয় পাহাড়ি শহর। কলকাতা থেকে সরাসরি মানালি যাওয়ার ট্রেন বা ফ্লাইট নেই, তবে কয়েকটি সহজ উপায়ে আপনি মানালিতে পৌঁছে যেতে পারেন।
১) ফ্লাইটে কলকাতা থেকে মানালি
কলকাতা → দিল্লি → কুলু -মানালি (ভুন্টার এয়ারপোর্ট) . এখান থেকে ট্যাক্সি করে মানালি। খরচ অনেক। ১৫০০০ এর কাছাকাছি।
A. কলকাতা থেকে দিল্লি ফ্লাইট
কলকাতা (CCU) থেকে দিল্লি (DEL) প্রতিদিন অনেক ফ্লাইট আছে।
ফ্লাইট সময়: ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট (প্রায়)।
B. দিল্লি থেকে মানালি (ভুন্টার এয়ারপোর্ট)
মানালির সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর হলো ভুন্টার / কুল্লু এয়ারপোর্ট (KUU)। দিল্লি থেকে ভুন্টারে ছোট বিমান চলে। ভুন্টার থেকে মানালি দূরত্ব প্রায় ৫০ কিমি, গাড়িতে ১.৫–২ ঘণ্টা। এটাই সবচেয়ে দ্রুত পথ।
২) কলকাতা → দিল্লি → মানালি (ভলভো বাসে) দিল্লি থেকে মানালি ৯৫০-১০৫০ টাকা।
এটি সবথেকে ভালো রুট।
A. প্রথমে কলকাতা থেকে দিল্লি ফ্লাইট
প্রতিদিন প্রচুর ফ্লাইট। সময়: ২ঘণ্টা+ খরচ ৫০০০
B. দিল্লি থেকে মানালি ভলভো বাস (৯৫০-১০৫০ টাকা। )
কাশ্মীরি গেট বা মজান্না থেকে বাস ছাড়ে। সময় নেয় ১২–১৪ ঘণ্টা। সব নাইট সার্ভিস। ভয়ানক রাস্তা। ভীষণ জোরে বাস চলে। আরামদায়ক Volvo AC/Sleeper পাওয়া যায়।
৩) ট্রেনে কলকাতা থেকে মানালি
মানালি পর্যন্ত সরাসরি কোনও ট্রেন নেই। আপনাকে নিকটবর্তী স্টেশন পর্যন্ত যেতে হবে।
Option A — কলকাতা → দিল্লি → মানালি
কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত অনেক ট্রেন চলে। সেখান থেকে আবার বাস/ট্যাক্সি/ফ্লাইটে মানালি।
এছাড়াও অনেকে চন্ডিগড় হয়েও যাতায়াত করে। কলকাতা থেকে চন্ডিগড় ফ্লাইট এ তারপর বাস। ৮-৯ ঘন্টা মতো সময় নেয় বাস এ। আমরা প্রথমে ফ্লাইট এ দিল্লী এসে তারপর কাশ্মীরি গেট থেকে বাস ধরেছিলাম। অনলাইন বাস টিকিট বুক করা যায়। রেড বাস এর এপ্লিকেশন ও ব্যবহার করতে পারেন।
কোথায় থাকবেন ?
1) Hotel Him Regency (Mall Road থেকে ~0.11 কিমি) ≈ ₹ 1,155 + ট্যাক্স / রাত
2)The Veer Villa (Mall Road ~0.11 কিমি) ≈ ₹ 1,028 + ট্যাক্স / রাত
3)Hotel Snow View (Mall Road ~0.14 কিমি) ≈ ₹ 1,874 + ট্যাক্স / রাত
4)Aloka Resort (Mall Road সংলগ্ন) ≈ US $ 63.21 ≈ ₹ ৫,৫০০ / রাত
5)Rockland Cottage (Mall Road এলাকায়) রেট শুরু হয় প্রায় ₹ 945/রাত থেকে