11/07/2024
জেনে রাখুন
টাঙ্গুয়ার ভ্রমন নামে আপনাকে যা দেখানো হয়🌝
= = = = = = = = = = = = = = =
প্রতি বছর বর্ষা ও শরৎকালে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক পর্যটক টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমন করেন। যদি বলি যে, এই পর্যটকদের ৯৫% টাঙ্গুয়ার হাওর না গিয়েই টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমন সম্পন্ন করে ফেলেন, কথাটি কি বিশ্বাস করবেন? জ্বী, দূর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্য। টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমন নামে যা চলে তার প্রায় সবই “ফলস সামিট”।
একটু বিস্তারিত বলি।
সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলায় হাওর, বাওর ও বিলের সংখ্যা কয়েক শত। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থেকে মধ্যনগর এর মধ্যবর্তী এলাকার উল্লেখযোগ্য হাওর-বিল গুলো হলো, শনির হাওর, মতিয়ান বিল, বানুয়ার হাওর, পালাইর বিল, বটকাই বিল, সংসার বিল, রাউয়ার বিল, নাবাই বিল, ঘড়িয়াকুরি বিল, পচাশোল বিল, পাকেরতলা বিল, সোনার বিল, খাজুয়াউরি বিল, শৈলদিঘা বিল, টাঙ্গুয়ার হাওর ইত্যাদি। অর্থাৎ তাহিরপুর থেকে মধ্যনগর পর্যন্ত যে বিস্তীর্ণ জলরাশি, তা পুরোটাই টাঙ্গুয়ার হাওর নয়। এই পোস্টের সাথে সংযুক্ত তাহিরপুর এলাকার জলাভূমির ম্যাপ দেখলে বুঝতে পারবেন যে, টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থান ওয়াচ টাওয়ারের উত্তর-পশ্চিম দিকে।
সুনামগঞ্জ বা তাহিরপুর কেন্দ্রিক পর্যটকবাহী বিভিন্ন ট্রলার ও হাউজবোটগুলির তথাকথিত টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমনের রুট হলো সুনামগঞ্জ বা তাহিরপুর থেকে ছেড়ে শনির হাওর, মতিয়ান বিল, বটকাই বিল প্রভৃতি পার হয়ে বওলাই নদীর পারের হিজল বনের ধারে ওয়াচ টাওয়ার। এখানে পর্যটকরা গোছল করে, ওয়াচ টাওয়ারে উঠে হাওর দেখে। এরপর পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া হয়, পালাইর বিল, বড়্গপ বিল প্রভৃতি পার হয়ে টেকেরঘাটে। সেখানে তারা শহীদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রী লেক) ও লাকমাছড়া ভ্রমন করে টেকেরঘাটে রাত যাপন করে। পরদিন সকালে মূলত নদী ও খাল দিইয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় যাদুকাটা নদীতে। ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন বারিক্কা টিলা ও শিমুল বাগান দেখে পর্যটকদের তথাকথিত টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমন শেষ হয়। লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো এই দুই দিনে বিভিন্ন হাওর বিল ঘুরলেও ওয়াচ টাওয়ার পার হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে তাদের আর যাওয়া হয়না। ওয়াচ টাওয়ার থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে অল্প কিছুসময় গেলেই টাঙ্গুয়ার হাওর পাওয়া যায়। কিন্তু সুনামগঞ্জ/ তাহিরপুর কেন্দ্রিক ট্রলার ও হাউজবোটগুলির প্রায় কোনোটিই এই দিকে আর বোট নেয় না, কারন টুরিস্টরা জানে না, টাঙ্গুয়ার হাওর কোনটি। খুবই অল্প কিছু বোট ওয়াচ টাওয়ারে যাওয়ার সময় সামান্য একটু সময় টাঙ্গুয়ার হাওরে ঢোকে।
এখন কথা হলো ৯৫% পর্যটকের কথা কেন বলা হয়েছে? ৫% পর্যটক কারা যারা টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমন করে? উত্তর হলো, যারা মধ্যনগর দিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমন করেন তাদের বেশিরভাগই টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে পায়। মধ্যনগরের বোট গুলো ওয়াচ টাওয়ার বা টেকেরঘাট গেলে তাদেরকে কয়েক ঘন্টা ধরে টাঙ্গুয়ার হাওরের উপর দিয়েই যেতে হয়। এই পথটা সৌন্দর্যের দিক থেকেও তাহিরপুর রুটের চেয়ে অনেক অনেক বেশি সুন্দর। টাংগুয়ার হাওরের চমৎকার সৌন্দর্য, জলজ ইকোসিস্টেম, জলতলের জলজ উদ্ভিদরাজির দেখা পাওয়া যায় টাংগুয়ার স্বচ্ছ জলের নিচে। এই পথে টাঙ্গুয়ার ভ্রমন করলে বোঝা যাবে, বাংলাদেশের আর দশটা বিল হাওরের পরিবর্তে টাঙ্গুয়াকেই কেন ইউনেস্কো 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ রামসার সাইট' ঘোষনা করেছে।
প্রতিবছর অর্ধলক্ষাধিক পর্যটক, কয়েক কোটি টাকা খরচ করে “টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমন” করলেও তাদের ৯৫% পর্যটকই টাঙ্গুয়ার হাওর এর দেখাই পান না? টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমন এর নামে অন্য কিছু বিল হাওর দেখে, আরও কিছু তথাকথিত “স্পট কাভার” করে, পেট ভরে খেয়ে তারা ফিরে যান। তারা জানতেও পারেন না টাঙ্গুয়ার হাওরের রুপ, রঙ, রস ও কেমন।