16/11/2025
আজ ছিলো হাওরাঞ্চলের কিংবদন্তীতুল্য মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জগতজ্যোতি দাস বীরবিক্রমের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এইদিনে নিজগ্রাম জলসুখার এক হাওরে রাজাকার ও পাকিস্তানী আর্মির সাথে সারাদিন সম্মুখসমরে লিপ্ত থেকে নিজ বাহিনীকে কাভার দিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারলেও সন্ধ্যার আগে আগে তিনি শত্রুবেষ্টনীর মধ্যে আটকা পড়ে গুলিবদ্ধ হয়ে নিহত হন। তাঁর সহযোদ্ধা ইলিয়াস তাঁকে কচুরীপানা ও কাদায় চাপা দিয়ে রাতের অন্ধকারে শত্রুবেষ্টনী থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও সকালে রাজাকারেরা তাঁর লাশ ঠিকই খুঁজে বের করেন। রাজাকার ও পাকবাহিনীর সন্মিলিত দল জগতজ্যোতির লাশ নিয়ে তাঁর নিজ গ্রামের বাড়ির সামনে এসে যখন উল্লাস করছিলো তখন এক অদ্ভুত ঘটনার অবতারণা হয়। জগতজ্যোতির মা এই লাশ জগতজ্যোতির বলে সরাসরি অস্বীকার করেন। যদিও তাঁকে নিজ মায়ের না চেনার কোন কারণই ছিলোনা। তবু শত্রুকে কনফিউজ করতে শহীদমাতার এই চোয়ালবদ্ধ সাহসী পদক্ষেপ! এরপর রাজাকারেরা জগতজ্যোতির লাশ ট্রলারে নিয়ে হাওরের বিভিন্ন হাটে হাটে দেখিয়ে আনন্দ মিছিল করে শেষ পর্যন্ত হাওরের সবচে বড় বাজার আজমিরীগঞ্জে এসে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে লাশ বেঁধে সারাদিন রাত দেখানোর ব্যবস্থা করে। সেদিন ছিলো ঈদের আগের দিন চাঁদরাত। হাট করতে আসা হাজার হাজার মানুষ এই দৃশ্য দেখেছিলেন। পাক আর্মি বাজারের এক ফটোগ্রাফারকে দিয়ে শেষ ছবিটা তোলায়। ফটোগ্রাফার জানের রিস্ক নিয়ে ছবিটির একটা এক্সট্রা কপি রাখে ও হাওরাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ সমন্বয়কারী সালেহ চৌধুরীর কাছে পাঠান। পরবর্তীতে জগতজ্যোতির লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়!
মুক্তিযুদ্ধের সময় জগতজ্যোতি ছিলেন দাস পার্টি নামের সবচে আতংক সৃষ্টিকারী গেরিলা গ্রুপের লিডার। আজকের টেকেরঘাটের বড়ছড়া বাজার থেকে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে পাক বাহিনী ও রাজাকারদের অস্থির করে রেখেছিলো এই বাহিনী৷ একটা ৩৬ জনের ছোট গ্রুপ থেকে তাই শহীদ সিরাজসহ তিনজন বীর বিক্রম খেতাব পেয়েছিলেন। জগতজ্যোতির মৃত্যুর পর অল ইন্ডিয়া রেডিও, আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও ৭৩ সালের গেজেটে তাঁর নাম আসে বীরবিক্রম হিসেবে। ৭৩ সালের গেটেজ ঘোষিত ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠের তিনজন ছিলেন সেনাবাহিনীর, দুইজন ইপিআরের, একজন বিমান ও নৌবাহিনীর! সামরিক রিকোমন্ডেশনে প্রণীত গ্যালান্টারি এওয়ার্ড তালিকায় তাই বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে বেসামরিক জনযোদ্ধা জগতজ্যোতি দাস ঠাঁই পাননি!
(স্বাধীনতা যুদ্ধের গ্যালান্টারি বা সাহসিকতার এওয়ার্ডসমূহ সন্মুখযুদ্ধে অংশ না নেওয়া এমনকি রাইফেল হাতে না নেওয়া সামরিক করণিকদের মধ্যে বিতরণ হতে দেখে ও জগতজ্যোতিকে তাঁর প্রাপ্য বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি না দেয়ার প্রতিবাদে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রব সাদী তাঁর বীর প্রতীক উপাধি বর্জন করেন।)