04/11/2025
আমি পাহাড়পর্বতে ঘুরে বেড়ানো মানুষ। আমার মতো যারা পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায় তাদের সবাইকে একটা প্রশ্ন প্রায়ই শুনতে হয়, “কেন যেতে চাও ওখানে?”
নিতান্ত সাদামাটা, সহজ একটা প্রশ্ন। তবে উত্তরটা মোটেও সাদামাটা নয়। অনেক মানুষ অনেক সময় অনেকভাবে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর উত্তরটা কার? এক কথায় বলে দেয়া যায় এ প্রশ্নের সবচেয়ে সুন্দর উত্তরটা দিয়েছিল জর্জ ম্যালোরি, আমার চাইল্ডহুড হিরো, প্রথম মানুষ যিনি এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখেছেন।
একটু বোধহয় অবাক হওয়ার কথা সবার। আমরা তো জানি প্রথম এভারেস্টে উঠেছিলেন তেনজিং নোরগে আর এডমন্ড হিলারি। তাহলে ম্যালোরির নাম কোথা থেকে আসছে?
ম্যালোরি প্রথম এভারেস্টে যান ১৯২১ সালে। বৃটিশ আর্মি একদল লোক পাঠাইসিল এভারেস্টে যাওয়ার রাস্তা খোঁজার জন্য। সেই দলে ছিল ম্যালোরি। ম্যালোরি এভারেস্টে গেলেন, দেখলেন, তারপর চূড়ায় যাওয়ার জন্য মোটামুটি একটা রাস্তা দেখে চলে আসলেন। পরেরবছর, ১৯২২ সালে বৃটিশ আর্মির আসল দল পাঠানো হইল এভারেস্ট জয় করার জন্য। অক্সিজেন ট্যাংক আর পাহাড়ে চড়ার অন্যসব যন্ত্রপাতিসহ। এইটাই মানুষের প্রথম এভারেস্ট অভিযান। এইবারও ম্যালোরি দলে।
কিন্তু সফলতা আসল না। ঊনত্রিশ হাজার ফুট উঁচা দানবের শরীর বেয়ে উঠার সময় ঝড় আসল। মারা গেল সাত জন শেরপা। এভারেস্ট চড়তে গিয়া এই প্রথম মানুষ মারা গেল। অল্পের জন্য প্রাণে বাঁইচা গেল ম্যালোরি।
কিন্তু চোখের সামনে সাতজন মানুষ মরতে দেখসে সে। ট্রমা ছাড়ল না বহুদিন। এইদিকে বয়স পঁয়ত্রিশ হয়ে গ্যাছে, বাচ্চা হইসে তিনটা। সবাই ধইরা নিল ম্যালোরি আর পাহাড়টাহাড়ের ধারে কাছে যাবে না। কিন্তু একবার যার মনে পাহাড়ের নেশা ধরে তারে কি আর থামান যায়?
১৯২৪ সালে আবার এভারেস্টের পথ ধরল ম্যালোরি। বউ বাঁধা দিল তারে, যাইতে দিবে না। ম্যালোরি মানিব্যাগ বের করে সেইখানে রাখা বউয়ের ছবিটা দেখাইল, দেখায়া বলল, “এইবার যদি এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে পারি তো চূড়ায় তোমার এই ছবি রাইখা আসব।”
এরপর আর আটকানো গেলো না ম্যালোরিরে। ২২ বছরের তরুণ এন্ড্রু আরভিনরে নিয়া আবার এভারেস্টের পথে পা বাড়াইল সে। ততোদিনে নেপালের সাথে বৃটিশদের চরম ঝামেলা শুরু হইসে। নেপাল ঘোষণা দিয়া দিসে কোন বৃটিশ নাগরিক নেপালে ঢুকতে পারবে না।
ম্যালোরিদের দমানো গেল না তাতে। এভারেস্টের একপাশে নেপাল আরেকপাশে তিব্বত। নেপাল না গিয়া সে গেল তিব্বতে। তারপর তিব্বতের পাশ থেকে উঠা শুরু করল এভারেস্টে। চূড়ায় উঠার পথে তারা শেষ ক্যাম্প করল সাতাশ হাজার ফুট উচ্চতায়। এভারেস্টের উচ্চতা ঊনত্রিশ হাজার ফুটের কিছু বেশী।
সেই ক্যাম্প থেকে ম্যালোরি আর আরভিন চূড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন ১৯২৪ সালের ৮ জুন। ক্যাম্পে থেকে যাওয়া বাকি সঙ্গীরা দুপুর সাড়ে বারটার দিকে ওদের দুইজনকে শেষবারের মতো দেখতে পাইল ২৮৮০০ ফুট উচ্চতায়। আর আড়াইশো ফুট উঠলেই এভারেস্ট জয় হয়ে যাবে। কিন্তু ওইটাই শেষ দেখা। এরপর আর কেউ তাদের কোনদিন জীবিত দেখতে পায় নাই।
ম্যালোরি আর আরভিন নিঃখোঁজ হওয়ার পর এক এক করে পঁচাত্তর বছর পার হয়ে গেল। শেষে ১৯৯৯ সালে খুঁজে পাওয়া গেল ম্যালোরির লাশ। তুষার শুভ্র ওই পাহাড়গুলার সবচে ভয়ংকর দিক হইল ঠান্ডা, কিন্তু এই ঠান্ডার কারণেই এতোদিন পরেও ম্যালোরির লাশ পাওয়া গেল একদম অক্ষত অবস্থায়। শুধু লাশ না, লাশের সাথে ম্যালোরি ক্যাম্প থেকে যা যা নিয়ে বের হইসিলেন তার সব পাওয়া গেল। গগলস, ছুড়ি, দড়ি সব। কিন্তু একটা জিনিস পাওয়া গেল না। সেইটা ম্যালোরির বউয়ের ছবি। ম্যালোরি বলসিল এভারেস্ট জয় করতে পারলে ওই ছবি চূড়ায় রেখে আসবে।
১৯২৪ সালে এভারেস্ট অভিযানের আগে ম্যালোরিকে জিজ্ঞেস করা হইসিল, “ইভেন আফটার অল দোজ ড্যাঞ্জার্স এন্ড এক্সিডেন্টস, হোয়াই ডু ইউ ওয়ান্ট টু গো দ্যায়ার?” সেই প্রশ্ন যে প্রশ্ন শুনতে হয় পাহাড়কে ভালোবাসা প্রতিটা মানুষকে। জবাবে ম্যালোরি দিসিলেন এক মহাকাব্যিক উত্তর, “বিকজ ইট ইজ দ্যায়ার।”
আজ থেকে চব্বিশ বছর আগে, ১৯৯৯ সালের পয়লা মে ম্যালোরির লাশ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো এভারেস্টের বুকে। ম্যালোরি আমার চাইল্ডহুড হিরো। তার থেকে আমি অনুপ্রেরণা পাই। এই লোক আমার মাথা আওলায় দিসিলেন। আমি বিশ্বাস করি, তেনজিং নোরগে আর স্যার এডমন্ড হিলারিরও ২৪ বছর আগে ম্যালোরি এবং তার সঙ্গী অ্যান্ড্রু আরভিন এভারেস্ট জয় করসেন। আরভিনের লাশ আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় নাই। এভারেস্টের শুভ্র বুকে, সবার থেকে দূরে তিনি ঘুমিয়ে আছেন।
- গুপ্ত
That's my answer