26/05/2025
গল্প: ভয়ংকর সুন্দরবন
২০০৫ সাল। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ জন ছাত্রের একটি দল সুন্দরবনের উদ্দেশে রওনা দেয়। উদ্দেশ্য, নিছকই আনন্দ আর প্রকৃতির মাঝে কিছু দিন কাটানো। বিশাল এক জাহাজে করে তারা যখন সুন্দরবনের কাছাকাছি পৌঁছাল, সবার চোখেমুখে তখন সীমাহীন উত্তেজনা। নির্ধারিত স্থানে জাহাজ ভেড়ার পর সবাই মিলে নামল ম্যানগ্রোভের ঘন জঙ্গলে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, দলের ৭ জন ছাত্র-ছাত্রী—আসিফ, রাতুল, শফিক, জাহিদ, তুলি,রেবা আর মাহিদ(ছদ্দনাম)—একটু বেশি গভীরে চলে যায়। তারা যখন বুঝতে পারল যে পথ ভুল করেছে, তখন বাকি দল অনেক দূরে। জাহাজও তাদের রেখে ফিরে গেছে।
সুন্দরবনের গহীনে সূর্য তখন প্রায় ডুবুডুবু। চারপাশে নামছে সন্ধ্যার অন্ধকার। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ কমে আসছে। হঠাৎ গা ছমছম করা নিস্তব্ধতা নেমে আসে চারপাশে। আসিফ টর্চ জ্বালাতেই দেখে, গাছের ডালে অসংখ্য বাদুড় উল্টো হয়ে ঝুলে আছে। রাতুল বলল, "আমরা মনে হয় পথ হারিয়ে ফেলেছি।" শফিক, জাহিদ আর মাহিদ ততক্ষণে বেশ ঘাবড়ে গেছে। তারা হাঁটতে শুরু করল পথ খুঁজে বের করার জন্য। কিন্তু সুন্দরবনের গোলকধাঁধার মতো পথে তারা শুধু ঘুরপাক খাচ্ছিল।
কিছুদূর যাওয়ার পর তারা একটা ভাঙা কুঁড়েঘরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেল। ভয়ে ভয়ে তারা সেদিকে এগিয়ে গেল। কুঁড়েঘরের ভেতর ঢুকেই আসিফের টর্চের আলোয় যা দেখল, তাতে তাদের রক্ত হিম হয়ে গেল। মেঝেতে কিছু পুরোনো হাড়গোড় আর চারপাশে ছড়ানো ছেটানো কিছু ছেঁড়া কাপড়। হঠাৎ মাহিদ চিৎকার করে উঠল, "ওই দেখো!" সবাই তাকিয়ে দেখে, দেয়ালের গায়ে খোদাই করা কিছু অস্পষ্ট ছবি। সেগুলোর মধ্যে একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন বিভৎস চেহারার মানুষ, যার চোখ দুটো জ্বলছে আগুনের মতো।
বাইরে তখন চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। গাছের পাতাগুলো অদ্ভুতভাবে নড়ছে। হঠাৎ জাহিদ নিচু স্বরে বলল, "তোরা কিছু শুনতে পাচ্ছিস?" সবাই কান পেতে শুনল। একটা ফিসফিসানি শব্দ, যেন কেউ তাদের নাম ধরে ডাকছে। আসিফ সাহস করে বলল, "কে ওখানে?" কোনো উত্তর নেই। শুধু বাতাস বইছে শনশন করে। এরপরই ঘটল সেই ভয়ংকর ঘটনা। কুঁড়েঘরের ভাঙা দরজা দিয়ে একটা ছায়া মূর্তি ঘরে ঢুকল। তার চোখ দুটো জ্বলছিল দাউ দাউ করে। বিভৎস একটা হাসি দিয়ে ছায়া মূর্তিটা তাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ভয়ে তাদের গলা শুকিয়ে কাঠ। পালানোর কোনো পথ নেই। মনে হচ্ছিল, সেই অতৃপ্ত আত্মা তাদের খুঁজছে।
তারা চোখ বন্ধ করে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে লাগল। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখে, ছায়া মূর্তিটা নেই। কিন্তু তাদের মনে হলো, যেন কেউ তাদের কাঁধে হাত রেখেছে। শফিক ভয়ে জ্ঞান হারাল। বাকিরা তাকে নিয়ে কোনোমতে বেরিয়ে এল কুঁড়েঘর থেকে।
তারা যখন কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে এসে দৌড়াচ্ছিল, হঠাৎ সামনে পড়ল এক বিশাল বাঘ । রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার! অন্ধকারে তার চোখ দুটো জ্বলছে। বাঘটা তাদের দিকে তাকিয়ে একটা হুংকার ছাড়ল। ভয়ে তাদের আত্মা খাঁচাছাড়া। তারা জানত, সুন্দরবনে বাঘ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু এমন বিপদের মুখে তাদের জীবন বাজি রেখে পালাতে হবে। বাঘটা তাদের দিকে তেড়ে আসার আগেই আসিফ তার হাতের মশালটা (যেটা সে কুঁড়েঘরের পাশ থেকে পেয়েছিল) বাঘের দিকে ছুঁড়ে মারল। বাঘটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এই সুযোগে তারা সবাই দৌড়ে একটা উঁচু গাছে উঠে পড়ল। সারা রাত ভয়ে ভয়ে গাছের ওপরই কাটাল তারা।
পাঁচ দিন পর, যখন তারা ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় অর্ধমৃত, তখন একটা বিচের ধারে কোস্টগার্ডের একটি দল তাদের দেখতে পায়। কোস্টগার্ডের দল তাদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পর তারা সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু সুন্দরবনের সেই ৫ দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাদের মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে যায়। বিভৎস ভূতের মুখোমুখি হওয়া আর বাঘের থাবা থেকে বেঁচে ফেরা - এই স্মৃতিগুলো তাদের জীবনে এক অবিস্মরণীয় দুঃসাহসিক অধ্যায় হয়ে থাকবে।