12/05/2026
স্মৃতির পাতায় ফিরে তাকালে দেখি, জীবনের এক দীর্ঘ সময় আমি মিথ্যার আড়ালে আশ্রয় নিয়েছি। শৈশবে সেই মিথ্যার পেছনে ছিল শাসনের ভয় আর অপমানের গ্লানি থেকে নিজেকে রক্ষার আকুতি। কৈশোরে এসে সেই মিথ্যা রূপ নিল 'সাদা মিথ্যায়'—বিবাদমান দুই হৃদয়কে মিলিয়ে দিতে আমি একজনের সুখ্যাতি অন্যের কানে পৌঁছে দিতাম। তখন মনে হতো, সত্যের চেয়ে এই কল্যাণকর মিথ্যার ধার বুঝি অনেক বেশি। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে আমি ছিলাম এক সুনিপুণ কারিগর।
কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরে গেল তখন, যখন প্রথমবার আমার কোল আলো করে একটি প্রাণের আগমনের সংবাদ পেলাম। মাতৃত্বের এই অমোঘ আহ্বানে নিজেকে নতুন করে গড়ার এক তীব্র সংকল্প জেগে উঠল মনে। সামাজিক মাধ্যমের কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে শুরু করলাম এক কঠিন 'সেলফ-ইম্প্রুভমেন্ট' বা আত্ম-শুদ্ধির ব্রত।
প্যারেন্টিং নিয়ে তখনো বিশদ পাঠ শুরু করিনি, কিন্তু একটি শাশ্বত সত্য আমার হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল— প্যারেন্টিং মানে সন্তানকে শাসন করার পদ্ধতি নয়, বরং নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এই যাত্রায় সন্তানের কোনো সক্রিয় ভূমিকা নেই, আছে কেবল তার নীরব উপস্থিতি। সন্তান হলো আমাদের ভেতরকার আয়না।
সেই ভাবনা থেকেই শুরু হলো নিজের 'তরবিয়াহ' বা চরিত্র গঠনের কাজ। প্রথম সংকল্পটি ছিল—পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আমি আর কখনো মিথ্যার আশ্রয় নেব না। গত চার বছরের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি, এই 'সদাই সত্য কথা বলা'র অভ্যাসটিই হলো প্যারেন্টিংয়ের সবচেয়ে জাদুকরী কৌশল।
কেন আমরা শিশুদের সামনে মিথ্যার জাল বুনি?
আমাদের শিশুদের মস্তিষ্কের যুক্তিদাতার অংশটি এখনো পুরোপুরি বিকশিত নয়। আমি তাদের ভালোবেসে মাঝে মাঝে বলি 'ব্রেইনলেস'। আমরা যখন মুখে বলি "কখনো মিথ্যা বলবে না", তাদের অবুঝ মস্তিষ্ক সেই শব্দগুলো শোনে না; বরং তাদের 'মিরর নিউরন' খুব নিপুণভাবে অনুকরণ করে আমাদের আচরণকে। আপনি যখন পরম আত্মবিশ্বাসে মিথ্যা বলছেন, তারা সেটিকেই আদর্শ লিপি হিসেবে গ্রহণ করছে।
অনেক সময় শিশুরা কাল্পনিক গল্প বলে, যাকে আমরা অনেক সময় 'মিথ্যা' বলে ভুল করি। আসলে সেটি তাদের সৃজনশীল চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। তাদের এই কল্পনাকে 'মিথ্যুক' তকমা দিয়ে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করবেন না। বরং তাদের গল্পগুলো মুগ্ধ হয়ে শুনুন, সত্য-মিথ্যা যাচাই করুন গভীর মমতায়।
আমরা প্রায়ই অজান্তে আমাদের দ্বিমুখী আচরণ বা 'ডাবল স্ট্যান্ডার্ড' দিয়ে শিশুদের বিভ্রান্ত করি। যেমন:
অনাকাঙ্ক্ষিত কেউ খুঁজলে সন্তানকে দিয়ে বলানো— "বল দাও, আব্বু/আম্মু বাসায় নেই।"
অবাধ্য হলে ভূতের ভয় দেখানো।
পুলিশ বা ডাক্তারের ইনজেকশনের ভয় দেখিয়ে সাময়িক স্বস্তি খোঁজা।
এই যে সাময়িক সমাধানের জন্য আমরা তাদের ওপর ভয়ের সংস্কৃতি চাপিয়ে দিই, এতে আমরা দীর্ঘমেয়াদে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলি। এক সময় শিশু বুঝতে পারে তার অভিভাবক তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গল্প ফাঁদছেন। তখন থেকে আপনি সত্য বললেও তাকে বিশ্বাস করাতে 'সৃষ্টিকর্তার কসম' খেতে হয়। এর চেয়ে বড় করুণ আর কী হতে পারে?
ভয় নয়, তথ্যের শক্তিতে সন্তান বড় হোক
আমি বিশ্বাস করি, সন্তানকে ভয়ের গোলকধাঁধায় না ফেলে সরাসরি বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করানো উচিত। মিথ্যা সমাধানের চেয়ে সঠিক তথ্য প্রদান অনেক বেশি ফলপ্রসূ:
১. ভয় নয়, পুষ্টির কথা বলুন: "ভাত না খেলে ভূত আসবে না, বরং তোমার শরীরে শক্তি হবে না, তুমি বন্ধুদের সাথে দৌড়াতে পারবে না।"
২. অসুস্থতায় ধৈর্য শেখান: "ওষুধটা হয়তো তেতো, কিন্তু এটা না খেলে তোমার অসুখ সারবে না। তুমি কি নিজেই খাবে, নাকি আমি সাহায্য করব?"
৩. ধর্মীয় বিধানের সৌন্দর্য: "আল্লাহর আইন আমার জন্য বড়দের মতো, কিন্তু তোমার জন্য তিনি কেবল ভালোবাসা। তিনি তোমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।"
আমার দুই সন্তান আজও 'মিথ্যা' শব্দটির সাথে পরিচিত নয়। তাদের শব্দকোষে কেবল দুটি বিভাগ আছে— 'শিওর কথা' আর 'কথার কথা'। তারা যখন বাইরের জগত থেকে কোনো তথ্য পায়, আমার কাছে এসে যাচাই করে নেয়— "মা, এটা কি শিওর কথা?" তখন মনে হয়, আমি সঠিক পথেই হাঁটছি।
আমার মতে, শিশুদের ১০ বছর বয়সের আগে 'মিথ্যা' বা 'পাপ'-এর মতো ভারী শব্দের সাথে পরিচয় না করানোই ভালো। সেই বয়সে তারা যুক্তি এবং ধর্মের মর্মার্থ বুঝতে শুরু করবে। তখন সে কেবল স্রষ্টার ভয়ে নয়, বরং সত্যের প্রতি এক গভীর ভালোবাসা থেকে সত্য বলবে।
সন্তানকে সত্যবাদী করতে হলে আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়। সত্য বলা কোনো কঠিন ব্যাকরণ নয়, এটি একটি জীবনবোধ।
আপনার অভিজ্ঞতায় সন্তানের সত্য বলার পথে আপনি কোন কৌশলটি অবলম্বন করেন? আপনার ভাবনাগুলো আমাদের সাথে শেয়ার করে নিতে পারেন।