16/04/2026
অচেনা পৃথিবী -১
আনিস সাহেবের ড্রয়িংরুমে এক জোড়া সুটকেস হাঁ করে খোলা পড়ে আছে। তিনি আগামী পরশু সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন। একা। আজ তার ষাটতম জন্মদিন। জীবনের এই সংখ্যাটা আগে খুব ভারী মনে হতো, এখন মনে হচ্ছে সংখ্যাটা আসলে পালকের মতো হালকা। শুধু বুকটা একটু ভারী।
এককালে আনিস সাহেব ছিলেন তুখোড় ছাত্রনেতা। যখন মিছিলে স্লোগান দিতেন, তখন রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টগুলো পর্যন্ত থরথর করে কাঁপত বলে তার অনুসারীরা দাবি করত। সেই মানুষটা বিয়ের পর আমূল বদলে গেলেন। তার দুনিয়া হয়ে উঠল তার স্ত্রী রেহনুমা আর দুই সন্তানকে ঘিরে।
আনিস সাহেবের একটা প্রতিজ্ঞা ছিল—পরিবার ছাড়া তিনি কখনো ভ্রমণে যাবেন না। বছরে দুবার নিয়ম করে তারা বেড়াতে যেতেন। তার ছোট ছেলেটা স্পেশাল চাইল্ড। তাকে নিয়ে চলাফেরা করা কঠিন, কিন্তু আনিস সাহেব বলতেন, "আমার ছেলেকে রেখে আমি স্বর্গের নহর দেখতেও কোথাও যাব না।"
মানুষের প্রতিজ্ঞা ভাঙার জন্য নিয়তি খুব সাধারণ কিছু দৃশ্য তৈরি করে। সেবার তারা এক বিশাল ক্রুজ শিপে করে সিঙ্গাপুর যাচ্ছিলেন। মাঝসমুদ্রে ছেলেটার মেজাজ এমন বিগড়ে গেল যে টানা তিন দিন সে চিৎকার আর ভাঙচুর করল। আনিস সাহেব দেখলেন, রেহনুমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে, মেয়েটার মুখ শুকিয়ে চুন। সেই প্রথম আনিস সাহেবের মনে হলো—এই ভ্রমণে আসলে কারোই আনন্দ হচ্ছে না। না ছেলেটার, না বাকিদের।
সেদিন রাতে কেবিনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে উত্তাল সমুদ্র দেখতে দেখতে আনিস সাহেব বিড়বিড় করে নিজেকেই বললেন, "ভ্রমণ মানে আনন্দ, শাস্তি নয়। এরপর থেকে ওকে ছাড়াই আমরা যাব।"
পরবর্তী বছরগুলোতে একে একে সবাই দৃশ্যপট থেকে সরে গেল। মেয়ে বড় হয়ে পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আনিস সাহেব তাড়াতাড়ি রিটায়ার করলেন যাতে শরীরে শক্তি থাকতে থাকতে পৃথিবীটা দেখে নিতে পারেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন রেহনুমা। তিনি দুটি চাকরি করেন, ছুটি মেলা ভার।
আজ ষাট বছরে পা দিয়ে আনিস সাহেব বুঝতে পারছেন, জীবনের সমীকরণ মেলানো বড় কঠিন কাজ। তার হাতে এখন টাকা আছে, সময় আছে, শরীরে সামান্য শক্তিও আছে—কিন্তু পাশে কেউ নেই।
তিনি সোলো ট্রাভেলার বা একক ভ্রমণকারী হিসেবে নিজেকে তৈরি করেছেন। কিন্তু সমস্যা হলো তার মনটা পড়ে থাকে পেছনে। প্রতি সপ্তাহান্তে তিনি তার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলেকে দেখতে যান। ছেলেটা তাকে চিনতে পেরে যখন ফিক করে হাসে, তখন আনিস সাহেবের মনে হয় দুনিয়ার সব পর্যটন কেন্দ্র তুচ্ছ।
সুইজারল্যান্ডের টিকিটটা টেবিলের ওপর পড়ে আছে। আনিস সাহেব রেহনুমাকে ডাকলেন।
"শোনো রেহনুমা, আল্পস পর্বতের ওপর যখন বরফ পড়ে, তখন নাকি চারপাশটা একদম সাদা হয়ে যায়। আমি কি একা সেই সাদা রং দেখে আনন্দ পাব?"
রেহনুমা রান্নাঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে বললেন, "কেন পাবে না? তুমি তো একা থাকতে ভালোবাসো।"
আনিস সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। হিমু বা মিসির আলির মতো কোনো রহস্যময় উত্তর তার মাথায় এল না। তিনি শুধু বুঝলেন, মানুষ যখন যুবক থাকে তখন ভাবে সে একা সারা পৃথিবী জয় করতে পারবে। আর যখন তার বয়স ষাট হয়, তখন সে আবিষ্কার করে—তার জয় করা পৃথিবীর এক কোণায় যদি তার প্রিয়জনরা বসে না থাকে, তবে সেই পৃথিবীটা আসলে একটা ধূসর মরুভূমি।
তিনি সুটকেসটা বন্ধ করলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সুটকেসটা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারী মনে হচ্ছে। হয়তো এর ভেতর এক চিমটি অপরাধবোধ আর অনেকটা একাকীত্ব ঢুকে পড়েছে।
- অচিন রহমান।