17/05/2026
গত কয়েক বছর সৌদিআরবে কেন্দ্রীয় হজ্জ ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে খুব কাছ থেকে লাখো মানুষের হজ্জযাত্রা দেখার সুযোগ হয়েছে। একসময় আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—হজ্জ কেবল ধনীদের ইবাদত। যাদের অঢেল অর্থ-সম্পদ আছে, কেবল তারাই বুঝি আল্লাহর ঘরে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেন। আর যাদের জীবন অভাবের হিসাব কষতেই কেটে যায়, তাদের কপালে হজ্জের মতো ব্যয়বহুল ইবাদত লেখা থাকে না। কিন্তু আল্লাহ মানুষকে কখন, কীভাবে, কোন উপলব্ধির সামনে দাঁড় করিয়ে দেন—তা মানুষ নিজেও জানে না।
হজ্জ ম্যানেজমেন্টের অভিজ্ঞতা আমার বহু পুরনো ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। এখন আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি—হজ্জ মূলত অর্থের নয়, “মাকবুলিয়াতের” ইবাদত। এখানে টাকার চেয়ে বড় বিষয় হলো, আল্লাহর ডাক। আল্লাহ ডাক দিলে অসম্ভব পথও সহজ হয়ে যায়। আর তিনি ডাক না দিলে, মানুষ কাবার ছায়াতলে এসেও কখনো কখনো হজ্জের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে ফিরে যায়।
এই কয়েক বছরে আমি এমন অনেক মানুষকে দেখেছি, যাদের জীবন দারিদ্র্যের সাথে এমনভাবে মিশে আছে যে, সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায়। উত্তরবঙ্গের কোনো অজপাড়া গ্রামের এক গরিব কৃষক—যার গায়ে হয়তো দামি ইহরাম নেই, নেই বাহ্যিক জৌলুশ—সেই মানুষটিকেও দেখেছি কাবার সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে তাওয়াফ করতে।
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “চাচা, আপনি কীভাবে হজ্জে আসলেন?”
তিনি খুব সাধারণভাবে উত্তর দিয়েছিলেন— “বাবা, সারা জীবন আল্লাহর কাছে কানছি তাঁর ঘর দেখার জন্য। তিনিই সব ব্যবস্থা করি দিছেন।”
কী অদ্ভুত প্রশান্তি ছিল সেই উত্তরে! মনে হচ্ছিল, মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে আল্লাহর ফয়সালা কত গভীর, কত নিখুঁত!
আবার এর বিপরীত দৃশ্যও দেখেছি—যা মানুষকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দেয়। গত বছরের একটি ঘটনা আজও ভুলতে পারি না। একজন সুস্থ-সবল হাজী আরাফার ময়দানে গিয়ে আচমকা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। মুহূর্তের মধ্যে যেন মানুষটা বদলে গেলেন। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করলেন, নিজের স্ত্রীকেও মারধর করতে লাগলেন। উনার মুখ থেকে এমনসব কুফরিসুলভ কথা বের হচ্ছিল যে, আশেপাশের সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। শত চেষ্টা করেও তাকে আর আরাফা থেকে মুজদালিফায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তাকে হোটেলে ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল। সেদিন খুব গভীরভাবে অনুভব করেছিলাম— মানুষ নিজের শক্তিতে হজ্জ সম্পন্ন করে না; আল্লাহ যাকে তাওফিক দেন, সেই কেবল হজ্জ পূর্ণ করতে পারে।
আরেকটি পরিবারের কথা মনে পড়ে। পুরো সময় তারা মক্কায় ছিলেন। সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন। কিন্তু ৮ই জিলহজ্জে যখন কাফেলার সবাই মিনার উদ্দেশ্যে রওনা দিল, তখন তারা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন—তারা আর হজ্জ করবেন না। পরিবারের একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তাই দেশে ফিরে যাবেন। অনেক বুঝিয়েও তাদের মন পরিবর্তন করা যায়নি। অথচ একই দিনে আরেকজন হাজী গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ডাক্তার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন— “তার অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। জরুরি ভিত্তিতে হার্ট অপারেশন প্রয়োজন।” কাফেলার সবাই বাধ্য হয়ে তাকে হাসপাতালে রেখে মিনায় চলে গিয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল থেকে ফোন এলো— “এই রোগীকে কোনভাবেই রাখা যাচ্ছে না। তিনি মিনায় যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন।” শেষ পর্যন্ত জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ৮ই জিলহজ্জের শেষ প্রহরে তাকে মিনায় পাঠানো হলো। আর বিস্ময়করভাবে পরবর্তী পাঁচ দিন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় হজ্জের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—যেদিন তার ফিরতি ফ্লাইট ছিল সেদিন মদীনা থেকে জেদ্দায় ফেরার পথে বাসেই ইন্তেকাল করেন, এবং পরবর্তীতে এখানেই তার দাফন-কাফন সম্পন্ন করা হয়। খবরটা শুনে বুকের ভেতর কেমন এক শিহরণ জেগেছিল। মনে হচ্ছিল, আল্লাহ যেন তাঁকে কেবল নিজের ঘরের মেহমান হিসেবেই ডেকেছিলেন। হজ্জ পূর্ণ করিয়ে, হৃদয় পরিপূর্ণ করে, তারপরই তাঁকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিয়েছেন।
এ বছরও এমন বহু ঘটনা চোখের সামনে ঘটছে। কেউ প্রিয়জনের অসুস্থতার খবর শুনে ফিরে যাচ্ছেন, কারো আপনজন মারা গেছেন, আবার কেউ ব্যবসায়িক প্রয়োজনের কারণে হজ্জের আগেই দেশে ফিরে যাচ্ছেন। অথচ সবাই জানে যে, একবার সৌদি আরব ত্যাগ করলে এই মৌসুমে নতুন করে ফিরে এসে হজ্জ করার সুযোগ আর থাকে না।
এসব ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখার পর এখন আমার মনে একটাই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে— হজ্জ কেবল অর্থ দিয়ে হয় না। হজ্জ কেবল সামর্থ্যের নাম নয়। হজ্জ হলো সৌভাগ্যের নাম, হজ্জ হলো ডাকের নাম, হজ্জ হলো কবুলিয়াতের নাম। আল্লাহ যাকে নিজের ঘরের মেহমান হিসেবে কবুল করেন, দুনিয়ার কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারে না। আর যাকে ডাক আসে না, সে কাবার এত কাছে গিয়েও কখনো কখনো অপূর্ণ হৃদয় নিয়ে ফিরে যায়। তাই এখন আর কাউকে দেখে মনে হয় না—“তার টাকা আছে, তাই সে হজ্জে যাচ্ছে।” বরং মনে হয়— “আল্লাহ তাকে ডেকেছেন।”
২৮ ই জিলকদ ১৪৪৭হি. || মাক্কাতুল মোকাররমা
কপি- Saeeyd