01/09/2026
পাহাড়ের বুকে হারিয়ে যাওয়া বিভীষিকাময় ট্র্যাজেডি💔
ঢাকার মিরপুর থেকে পাঁচ বন্ধু জোবায়ের, মুন্না, সাগর, প্রিতম ও ঈদ- যখন সুউচ্চ পাহাড় আর ঝরনার টানে বান্দরবানের রুমা উপজেলার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন, তখন দূরতম কল্পনাতেও ছিল না এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। পাহাড়ে ট্র্যাকিং তাদের নতুন নয়, এর আগেও বেশ কয়েকবার দুর্গম পথ মাড়িয়েছেন তারা। কিন্তু ২০১৫ সালের এই সফরটি তাদের জীবনে নিয়ে এলো চিরন্তন এক আক্ষেপ ও বিভীষিকা।
২৭ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার কোলাহল ছেড়ে বাসে চেপে বসেন তারা। উদ্দেশ্য, পাহাড়ি প্রকৃতির রূপকন্যা রুমার ‘চ্যাপলং’ ঝরনা এবং সুউচ্চ কেওক্রাডং জয় করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী রুমা বাজারে পৌঁছে সেনাবাহিনী কার্যালয়ে নাম নথিভুক্ত করে পা বাড়ান বগালেকের পথে। লেকের নীল জলে ক্লান্তি ধুয়ে তারা ছুটে যান পাসিংপাড়ার দিকে। আদিবাসী পল্লীর নিরিবিলি পরিবেশে চার দিন কাটানোর পর ৩ অক্টোবর সকালে গল্প মোড় নেয় ট্র্যাজেডিতে।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রিতম, ঈদ ও সাগর সিদ্ধান্ত নেন সেখান থেকেই ফিরে আসবেন। তবে জোবায়ের, মুন্না এবং স্থানীয় গাইড মাঙসাই ম্রো ছাড়তে চাননি চ্যাপলং ঝরনা দেখার লোভ। দুই বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে সকাল ১০টার দিকে ওই তিনজন রওনা হন সেপ্রুপাড়ার নিচের দুর্গম ঢালের দিকে। বিকেলেই খবর আসে, চ্যাপলংয়ের পথে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘আরাকান লিবারেশন পার্টি’ (এএলপি) অস্ত্রের মুখে দুই পর্যটক ও গাইডকে অপহরণ করে ভারতের মিজোরাম সীমান্তের দিকে নিয়ে গেছে।
এক নিমেষে আনন্দঘন ভ্রমণ পরিণত হয় বিভীষিকায়। প্রিতম ও সাগর নিরাপদে ঢাকায় ফিরলেও তাদের মন থেকে যায়নি পাহাড়ের সেই গহীন অরণ্যে। অপহৃতদের ফিরিয়ে আনতে গাইড মাঙসাইয়ের পরিবারের কাছে ফোন করে ৭ লাখ টাকার মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। কিন্তু রহস্যজনকভাবে এর পর থেকে মেলেনি কোনো নির্ভরযোগ্য সন্ধান। ঘটনাটি বিলাইছড়ি ও রুমা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হওয়ায় আইনি জটিলতা তৈরি হয় এবং তদন্তের ভার হাতবদল হয়ে ডিবি থেকে পরবর্তীতে সিআইডিতে যায়।
মুন্নার ঘরে স্ত্রী ফাতেমা তুজ জোহরা ও দুই অবুঝ সন্তান প্রতিদিন পথ চেয়ে বসে থাকে। রাত নামলেই বাবার জন্য ছোট সন্তানের কান্না ভারী করে তোলে ঘরের বাতাস। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য এমবিএ শেষ করা মেজো ছেলে জোবায়েরকে হারিয়ে দিশেহারা তার পিতা-মাতা। বন্ধু ও পর্যটক সংগঠনগুলো মানববন্ধনের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে সরব হলেও বছরের পর বছর কেটে গেলেও মেলেনি প্রিয়জনদের হদিস।
পাহাড়ের সেই নীল আকাশ আর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মায়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারের কাছে হেরে গেছে দুটি তাজা প্রাণ ও তাদের স্বপ্ন। ঢাকার মিরপুরে অপেক্ষা করা পরিবারগুলোর কাছে পাহাড় এখন আর সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং তা এক অন্তহীন ট্র্যাজেডির নাম।