16/05/2026
সচেতনতা পোস্ট: “কেমিক্যাল ফ্রি” ফল কি আসলেই সম্ভব?
বাংলাদেশে উৎপাদিত অধিকাংশ ফল ও শাকসবজিতে বিভিন্ন ধরনের পেস্টিসাইড ব্যবহার করা হয়।বাস্তবতা হলো, অনেক চাষি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি স্প্রে করেন, যেন উৎপাদন বেশি হয় এবং বাজারে পণ্যের চেহারা সুন্দর থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, পেস্টিসাইড ব্যবহারের সঠিক নিয়ম বা অপেক্ষাকাল (Waiting Period) কেওই মানে না।
তাই যদি কেউ আপনাকে বলে-
“আমাদের ফল সম্পূর্ণ কেমিক্যাল ফ্রি”
তাহলে বিষয়টি একটু ভেবে দেখুন। এবং মনে করুন এটা ডাহা মিথ্যা কথা। (বাণিজ্যিক চাষের ক্ষেত্রে)
কারণ প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ “কেমিক্যাল মুক্ত” ফল বা সবজি বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। কৃষিতে কোনো না কোনো ধরনের রাসায়নিক, সার বা কীটনাশক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়। বর্তমানে “কেমিক্যাল ফ্রি” কথাটি অনেক সময় শুধুই একটি মার্কেটিং ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষ করে আমের ক্ষেত্রে অনেক বাণিজ্যিক বাগানে উচ্চমাত্রায় পেস্টিসাইড ব্যবহার করা হয়। আগাছা দমনে গ্লাইফোসেটসহ বিভিন্ন রাসায়নিকও ব্যবহৃত হয়, যেগুলোর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা রয়েছে। আবার অনেক বিক্রেতা শুধু “হার্ভেস্টের পরে কেমিক্যাল দেওয়া হয় না” বিষয়টি প্রচার করেন, অথচ গাছে থাকা অবস্থায় কী ব্যবহার হয়েছে তা নিয়ে খুব কমই আলোচনা করেন। কিন্তু শুধু হার্ভেস্টের পরে কেমিক্যাল না দেওয়া মানেই নিরাপদ নিশ্চিত করে না।
আমাদের উচিত অন্ধভাবে “কেমিক্যাল ফ্রি” শব্দে বিশ্বাস না করে বাস্তবতা বোঝা। অনেকে পরামর্শ দেন বিক্রেতাকে কিছু প্রশ্ন করতে, যেমনঃ
১। কী ধরনের পেস্টিসাইড ব্যবহার করা হয়েছে?
২। সঠিক নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হয়েছে কি?
৩। হার্ভেস্টের আগে পর্যাপ্ত অপেক্ষাকাল (Waiting Period) মানা হয়েছে কি?
৪। ফলটি প্রাকৃতিকভাবে পাকানো হয়েছে কি?
কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জিজ্ঞেস করেও খুব বেশি লাভ হয় না। কারণ প্রায় সবাই খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে এমনভাবে উত্তর দেন, যেন সবকিছু শতভাগ নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত।
আবার অনেক অনলাইন বিক্রেতা নিজেরাও জানেন না পুরো মৌসুমে বাগানে কী কী পেস্টিসাইড ব্যবহার হয়েছে। কারণ তারা সরাসরি চাষি নন। অনেকেই স্থানীয় পাইকারি বাজার থেকে আম কিনে বিক্রি করেন। আমের মৌসুমে বাজারে গিয়ে আম সংগ্রহ করেন, আর আশেপাশের কিছু বাগানে ভিডিও করে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন পুরো বছর নিজেরাই বাগানের যত্ন নিয়েছেন।
আরেক শ্রেণির বিক্রেতা আছেন যারা নিজেরা বাজারেও যান না। তারা বিভিন্ন রিসেলার বা সরবরাহকারীর মাধ্যমে আম সংগ্রহ করে ক্রেতার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন। এদের মধ্যে অনেকে অনলাইনে খুব পরিচিত মুখও।
আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না বা কারও কাছ থেকে আম কিনতে নিষেধও করছি না। আমি শুধু একটি বাস্তবতা তুলে ধরতে চাই।
বাংলাদেশে উৎপাদিত অন্যান্য ফল ও সবজিকে আমরা যেভাবে বিবেচনা করি, আমকেও সেভাবেই বিবেচনা করা উচিত। যেমন বাজার থেকে বেগুন, আলু বা পটল কিনে খাই, তেমনভাবেই আমও বাজার থেকে বা অনলাইন থেকে কিনে খাওয়া উচিত। “কেমিক্যাল ফ্রি” শব্দ শুনেই অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হওয়া বা অন্ধভাবে বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই।
যেমন আলু, বেগুন, পটল বা অন্যান্য সবজি কিনতে গেলে কেউ সাধারণত “কেমিক্যাল ফ্রি” দাবি করে না। কিন্তু আমের ক্ষেত্রে এ শব্দটি খুব বেশি ব্যবহার হয়, যার অনেকটাই আবেগভিত্তিক মার্কেটিং।
সচেতন থাকুন, বাস্তবতা বুঝুন, এবং অতিরঞ্জিত মার্কেটিংয়ের চেয়ে দায়িত্বশীল ও সৎ উপস্থাপনাকে গুরুত্ব দিন।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু বিক্রেতা নয়, চাষি, বাজার ব্যবস্থা এবং আমাদের সবার সচেতনতা প্রয়োজন।