21/05/2026
যিলহজ্ব মাসের বিশেষ কিছু আমল-
-
হজ্ব কোরবানী সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ আমলের মাস যিলহজ্ব, এই মাসের নেক আমল আল্লাহ তাআলার নিকট খুবই প্রিয়। হাদীসে রাসুল সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا مِنْ أَيّامٍ الْعَمَلُ الصّالِحُ فِيهَا أَحَبّ إِلَى اللهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيّامِ يَعْنِي أَيّامَ الْعَشْرِ
আল্লাহর নিকট যিলহজ্বের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। [সুনানে আবু দাউদ-২৪৩৮, সহীহ বুখারী-৯৬৯]
-
জিলহজ্ব মাসের বিশেষ কিছু আমল:
-
১। যিলহজ্বের চাঁদ উদিত হওয়ার আগেই নখ, চুল ও অবাঞ্চিত লোম পরিস্কার করা।
যিলহজ্ব মাস হজ্বের মাস, হাজ্বী সাহেবানরা ইহরাম পরিধানের মাধ্যমে চুল নখ কাটা সহ আরো কিছু কাজ নিজেদের জন্য নিষিদ্ধ করে নেন। অন্যদের জন্য এসব কাজ নিষিদ্ধ না হলেও হাজ্বীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা অনেক ফযিলতপূর্ণ কাজ।
উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِذَا رَأَيْتُمْ هِلَالَ ذِي الْحِجّةِ، وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ، فَلْيُمْسِكْ عَنْ شَعْرِهِ وَأَظْفَارِهِ
যখন যিলহজ্বের দশক শুরু হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কুরবানী করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে। -[সহীহ মুসলিম ১৯৭৭; জামে তিরমিযী ১৫২৩]
যারা কোরবানী করবেন তাদের করণীয় তো এই হাদিসে স্পষ্ট, আর যারা কোরবানী করবেন না তারাও কোরবানীর ফজিলত অর্জনের জন্য এই আমল করবেন।
আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
أُمِرْتُ بِيَوْمِ الْأَضْحَى عِيدًا جَعَلَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ. قَالَ الرَّجُلُ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ أَجِدْ إِلَّا أُضْحِيَّةً أُنْثَى أَفَأُضَحِّي بِهَا؟ قَالَ: لَا، وَلَكِنْ تَأْخُذُ مِنْ شَعْرِكَ وَأَظْفَارِكَ وَتَقُصُّ شَارِبَكَ وَتَحْلِقُ عَانَتَكَ، فَتِلْكَ تَمَامُ أُضْحِيَّتِكَ عِنْدَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.
আমি কুরবানীর দিনকে ঈদ উদযাপন করতে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছি। আল্লাহ এ দিনকে এ উম্মাতের জন্য ঈদ হিসাবে নির্দিষ্ট করেছেন। এক সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার কাছে যদি শুধু একটি দুগ্ধ দানকারী উটনী থাকে আমি কি তা কুরবানী করব? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, তবে তুমি চুল, নখ ও মোঁচ কাটবে এবং নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহর দরবারে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গণ্য হবে। -[সুনানে আবু দাউদ ২৭৮৯]
-
২। বেশি বেশি তাসবীহ তাহলীল তাহমীদ পাঠ করা
-
তাসবীহ তাহলীল এমনিতেই আল্লাহ তাআলার অনেক প্রিয় আমল। যিলহজ্বের প্রথম দশকে এসব আমলের গুরুত্ব ও ফজিলত আরো বেড়ে যায়। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَا مِنْ أَيّامٍ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ وَلَا أَحَبّ إِلَيْهِ الْعَمَلُ فِيهِنّ مِنْ هَذِهِ الْأَيّامِ الْعَشْرِ، فَأَكْثِرُوا فِيهِنّ مِنَ التّهْلِيلِ وَالتّكْبِيرِ وَالتّحْمِيدِ.
আল্লাহ তাআলার নিকট যিলহজ্বের প্রথম দশকের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং আলহামদু লিল্লাহ পড়। - মুসনাদে আহমাদ ৫৪৪৬
-
৩। যিলহজ্বের প্রথম নয়দিন বিশেষত আরাফার দিন রোজা রাখা
-
যিলহজ্বের প্রথম দশকের আমলের গুরুত্ব অনেক, অন্যন্য আমলের পাশাপাশি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্বের প্রথম নয়দিন রোযা রাখতেন। হাদীসে এসেছে,
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجَّةِ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিলহজ্বের প্রথম নয়দিন রোজা রাখতেন। [আবু দাউদ- ২৪৩৭]
কারো পক্ষে পূর্ণ নয়দিন রোযা রাখা সম্ভব না হলে অন্তত নয় তারিখের রোযা রাখবেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ফজিলত সম্পর্কে বলেছেন-
صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ
আরাফার দিনের (নয় যিলহজ্বের) রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করি যে তিনি (এর দ্বারা) আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। -[সহীহ মুসলিম ১১৬২]
-
৪। আরাফার দিন বেশি বেশি দোয়া করা
-
যিলহজ্বের প্রথম দশকের মধ্যে আরাফার দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যন্য দিনের তুলনায় এইদিন দুআ ও যিকিরের গুরুত্ব অনেক বেশি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও পূর্ববর্তী নবীগণ এইদিন যে শব্দে দুআ ও যিকির করেছেন হাদীসে তা বর্ণিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
خَيْرُ الدّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ، وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِي: لَا إِلَهَ إِلّا اللهُ
وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
শ্রেষ্ঠ দোয়া হল আরাফার দিনের দোয়া। এই দিনের দোয়া হিসেবে সর্বোত্তম হল ঐ দোয়া, যে দোয়া আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ করেছেন। দোয়াটি হল-
لَا إِلَهَ إِلّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
- [সুনানে তিরমিযী, হাদীস ৩৫৮৫]
-
৫। তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা
-
নয় তারিখ ফজর থেকে তের তারিখ আসর পর্যন্ত প্রতি ফরজ নামাযের পর তাকবীর বলা ওয়াজিব। তাকবীরটি হল-
اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ لَا إِلَهَ إِلّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ وَلِلهِ الْحَمْدُ
জামাতে নামায পড়া হোক বা একাকি, পুরুষ বা নারী, মুকীম বা মুসাফির সকলের উপর ওয়াজিব। এমনকি ৯ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত কোনো নামায কাযা হয়ে গেলে এবং ঐ কাযা এই দিনগুলোর ভিতরে আদায় করলে সেই কাযা নামাযের পরও তাকবীরে তাশরীক পড়বে। পুরুষগণ তাকবীর উচ্চ আওয়াজে বলবে আর নারীগণ নিম্নস্বরে।
-
৬। সামর্থ্যবান হলে কোরবানী করা
-
কেউ যদি নেসাব পরিমান সম্পদের মালিক হয় তাহলে তার জন্য কোরবানী করা ওয়াজিব। সামর্থ্য থাকা সত্যেও কেউ যদি কোরবানী না করে তাদেরকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করেছেন। বলেছেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَ " مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে। [ইবনে মাজাহ ৩১২৩]
প্রিয় ভাইয়েরা, যিলহজ্ব মাস চলে এসেছে, আবার কয়দিন পর চলেও যাবে। বুদ্ধিমান তো সেই, যে এই সময়গুলোকে নেক আমলের মাধ্যমে জীবন্ত করবে। আল্লাহ তাআলার নেক বান্দাগণ এমন মুহূর্তগুলোকে গনীমত মনে করতেন। তারা নিজেরা আমলে মনোযোগী হতেন, স্ত্রী সন্তান সহ অধীনস্তদেরকেও উৎসাহ দিতেন।
তাবেয়ী সাঈদ ইবনে জুবাইর রহিমাহুল্লাহ যিলহজ্বের এই দিনগুলোতে ইবাদত অনেক বেশি বাড়িয়ে দিতেন। তিনি বলতেন, এই রাতগুলোতে তোমরা ঘরের বাতি নিভিয়োনা। অর্থাৎ রাত্রি জাগরণ করে আমলে লিপ্ত থাকো। তিনি আরো বলতেন, তোমরা ঘরের খাদেমদেরও আরাফার দিনের রোযার জন্য সাহরী খেতে তুলে দাও। -[হিলয়াতুল আউলিয়া]
---- ধন্যবাদ