06/12/2022
নিস্তব্ধ নিঝুম দ্বীপ
স্থান: হাতিয়া উপজেলা, নোয়াখালী
#নিঝুমদ্বীপ_রচনা:
২০০১ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার পুরো দ্বীপটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৩ সালে দ্বীপটি জাহাজমারা ইউনিয়ন হতে পৃথক হয়ে স্বতন্ত্র ইউনিয়নের মর্যাদা লাভ করে।
নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার দক্ষিণে ১৯৫০-এর দশকে এই দ্বীপটি জেগে ওঠে, এরপর ক্রমে পলি জমে দ্বীপটি আজকের আকার ধারণ করে। ১৯৭৪ সালের দিকে বন বিভাগ এই দ্বীপের উত্তর অংশে ব্যাপকভাবে বনায়ন করে, যার ফলে আজ ১৫ বর্গমাইল দ্বীপটির বেশির ভাগই পরিণত হয়েছে অভয়ারণ্যে। শুরুতে ‘চর ওসমান’ নামে পরিচিত হলেও ১৯৭৯ সালে সাবেক মন্ত্রী আমিরুল ইসলাম খান এই দ্বীপের নাম দেন ‘নিঝুম দ্বীপ’। নিঝুম দ্বীপের মূল জনবসতির নাম হলো ‘নামার বাজার’।
দ্বীপটি মূলত বেশ কিছু চরের সমষ্টি। এর মাঝে বয়ে চলেছে নদী আর খাল, যেন অবিকল সুন্দরবন। উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় শীতকালে শীতের তীব্রতাও তুলনামূলকভাবে এখানে কম। ফুরফুরে সামুদ্রিক বাতাস আর মনোলোভা প্রকৃতি মনে এনে দেবে দারুণ সুখের অনুভূতি। সম্প্রতি দ্বীপের বেশ দক্ষিণে জেগে উঠেছে নতুন এক চর, ভ্রমণপিয়াসীরা যার নাম দিয়েছেন ‘ভার্জিন আইল্যান্ড’।
#নামকরণের_ইতিহাস:
নিঝুম দ্বীপের পূর্ব নাম ছিলো চর-ওসমান, আবার কেউ কেউ একে ইছামতীর চরও বলত। জানা যায়, ওসমান নামের একজন বাথানিয়া তার মহিষের বাথান নিয়ে প্রথম নিঝুম দ্বীপে বসত গড়েন। তখন এই নামেই এর নামকরণ হয়েছিলো। পরে হাতিয়ার সাংসদ আমিরুল ইসলাম কালাম এই নাম বদলে নিঝুম দ্বীপ নামকরণ করেন। প্রায় ১৪,০৫০ একরের দ্বীপটি ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জেগে ওঠে। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জন বসতি গড়ে উঠে। ১৯৭০ এর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপটিতে কোন প্রানের অস্তিত্ব ছিলনা। ঘূর্ণিঝড়ের পরে তৎকালীন হাতিয়ার জননন্দিত নেতা আমিরুল ইসলাম কালাম সাহেব দ্বীপটিতে পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন যে কোন প্রানের অস্তিত্ব নাই, তাই তিনি আক্ষেপের সুরে বলে ছিলেন হায় নিঝুম! সেখান থেকে দ্বীপটির নতুন নাম নিঝুম দ্বীপ।
এ দ্বীপের মাটি চিকচিকে বালুকাময়, তাই জেলেরা নিজ থেকে নামকরণ করে বালুর চর। এই দ্বীপটিতে মাঝে মাঝে বালুর ঢিবি বা টিলার মতো ছিল বিধায় স্থানীয় লোকজন এই দ্বীপকে বাইল্যার ডেইল বা বাল্লারচর বলেও ডাকত। বর্তমানে নিঝুমদ্বীপ নাম হলেও স্থানীয় লোকেরা এখনো এই দ্বীপকে বাইল্যার ডেইল বা বাল্লারচর বলেই সম্বোধন করে।
মূলত বাল্লারচর, চর ওসমান, কামলার চর এবং মৌলভির চর - এই চারটি চর মিলিয়ে নিঝুম দ্বীপ।
#যে_সৌন্দর্যে_মুগ্ধ_হয়েছিলাম:
মূল দ্বীপসহ আশপাশের দ্বীপগুলোতে শীতকালে আসে হাজার হাজার অতিথি পাখি। এদের মধ্যে আছে সরালি, লেনজা, জিরিয়া, পিয়ং, চখাচখি, রাঙ্গামুড়ি, ভূতিহাঁসসহ নানারকম হাঁস, রাজহাঁস, কাদাখোঁচা, জিরিয়া, বাটান, গুলিন্দাসহ জলচর নানা পাখি, হরেক রকমের গাংচিল, কাস্তেচরা ইত্যাদি। কদাচিৎ আসে পেলিক্যান। আর বছরজুড়ে সামুদ্রিক ঈগল, শঙ্খচিল, বকসহ নানা স্থানীয় পাখি তো আছেই। দ্পাখি দেখতে হলে ট্রলারে করে পার্শ্ববর্তী দ্বীপগুলোতে যেতে হবে, পেরোতে হবে অনেকটা কাদা। কবিরাজের চর ও দমার চর পাখি দেখার জন্য বেশ উত্তম জায়গা।
দ্বীপের আশপাশের জঙ্গলেই আছে হরিণ, শেয়াল, বন্য শূকর, নানা রকম সাপ ও বানর। পাখি বা হরিণ দেখতে হলে খুব ভোরে উঠতে হবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বনবিভাগ ৭০-এর দশকে বন বিভাগের কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চার জোড়া হরিণ ছাড়ে। নিঝুম দ্বীপ এখন হরিণের অভয়ারণ্য। নিঝুম দ্বীপে হরিণের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। নিঝুম দ্বীপের মতো দেশের অন্য কোথাও একসাথে এত চিত্রা হরিণ দেখঅ যায় না। হরিণ মূল দ্বীপেই স্থানীয় গাইডদের সাথে গিয়ে দেখে আসতে পারবেন।
বিকেল থেকে সন্ধ্যাার মধ্যে কবিরাজের চরের কাছে চৌধুরীর খাল দিয়ে কিছুক্ষণ হাটলেই হরিণের দেখা পাওয়া সম্ভব। এছাড়া ট্রলার রিজার্ভ নিলে মাঝিই আপনাদের হরিণ দেখিয়ে আনবেন। সন্ধ্যায় কবিরাজের চরে সূর্যাস্থের সাথে হাজার মাহিষের পাল সত্যিই দর্শনীয়। আর কমলার দ্বীপে কমলার খালে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যায়।
#নামা_বাজার_সি_বিচ:
নামার বাজার থেকে নামা বাজার সি বীচ হেটে যেতে সময় লাগতে পারে ৯-১০ মিনিট। নামা বাজার সি বীচ সূর্য উদয় ও সূর্যাস্ত দেখা ছাড়াও বারকিকিউ করতে পারবেন।
#ভার্জিন_আইল্যান্ড:
দমার চরের দক্ষিণ দিকে নতুন সি বিচটি ভার্জিন আইল্যান্ড হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। এই আইল্যান্ডে নাম না জানা অনেক পাখির দেখা মিলে। এই দ্বীপে যেতে ৩০০০-৪৫০০ টাকা ট্রলার ভাড়া লাগবে।
এছাড়া ট্রলার রিজার্ভ নিয়ে ভোলার ঢালচর, চর কুকরি-মুকরিও দেখে আসতে পারবেন।
#আবাসন_সুবিধা:
শীতকাল অর্থাৎ অক্টোবর থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত নিঝুম দ্বীপ ভ্রমেণর জন্য উপযুক্ত সময়। বছরের অন্য সময় মেঘনা নদী ও সাগর বেশ উত্তাল থাকে, তাই ঐ সময় নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণ না করাই ভালো।
নামার বাজার’এর পর্যটন রিসোর্টে থাকতে পারবেন। পাঁচ বেডের ডরমিটরি রুম আছে, ভাড়া বেশ কম। বাজারেই আছে মসজিদ বোর্ডিং, এখানে খুবই কম খরচে থাকা যায়, তবে বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। গোটা দ্বীপেই সোলার প্যানেল অথবা জেনারেটর ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় সীমিত সময়ের জন্য। কাজেই বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বুঝেশুনে ব্যবহার করাই ভালো।
এ ছাড়া দ্বীপে থাকতে পারেন সরকারি উপজেলা কমপ্লেক্স অথবা বন বিভাগের ডাকবাংলোয়, তবে এগুলোর জন্য আগে থেকে অনুমতি নিয়ে রাখতে হয়। আর ক্যাম্পিং করতে চাইলে মূল দ্বীপেই করা ভালো। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আশপাশের চরগুলোতে মাঝেমধ্যে ডাকাত হানা দিয়ে থাকে।
খাওয়া-দাওয়া বাজার থেকেই করতে পারবেন। দাম অনেক কম পড়বে, তবে মাছ ছাড়া অন্যান্য খাবারের ক্ষেত্রে সংগত কারণেই বৈচিত্র্য পাবেন না।