23/08/2024
আজকের লেখায় কাপ্তাই বাঁধ সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন
কাপ্তাই বাঁধের পানি ছাড়ার কোন শঙ্কা নেই- কারণ
লেকের পানির ধারণ ক্ষমতা ১০৯ এমএসএল, লেকে পানির স্তর এথন ১০৫ এমএসএল-এ থেমেছে। অর্থাত বিপদসীমার চেয়ে পানি ৪ ফুট কম আছে। চট্টগ্রামের আকাশে রীতিমতো ঝলমলে রোদ, বৃষ্টি নেই। ফলে লেকে পানি বাড়ার খুব একটা শঙ্কা নেই। তা ছাড়া পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫টি উৎপাদন ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতি সেকেন্ডে ৩০ হাজার কিউসেক পানি খরচ হচ্ছে- যা স্বাভাবিক গতিতে কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে। এতে লেকের বর্ধিত পানির চাপ কমছে। ফলে আপাতত লেকের পানির চাপ বৃদ্ধি পাবেনা, বিপদসীমা অতিক্রম করবে এমন কোন আশঙ্কা নেই। ধরে নিতে পারেন কাপ্তাই লেক থেকে পানি ছাড়া হবে না।
তবুও শঙ্কা থাকে- যদি
ধরেন আবার প্রবল বর্ষন শুরু হলো, অথবা কাপ্তাই লেকের সীমান্ত ভারতের মিজোরাম রাজ্যে প্রবল বৃষ্টিপাত হতে শুরু করলো-তখন ভারতের পানি লুসাই পাহাড় ও টেকারমুখ হয়ে কাপ্তাই লেকে প্রবেশ করবে। এতে কাপ্তাই লেকের পানি ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিপদসীমা ছুঁয়ে ফেলতে পারে। তখন বিপদ এড়াতে লেকের পানি স্প্রীল ওয়ের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীতে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।
পানি ছাড়লে কি হবে?
নাহ। পানি ছাড়লেও খুব বেশি শঙ্কিত বা আতঙ্কিত হবার কারন নেই। কারণ, যদি লেকের পানির স্তর ১০৮ ফুট ছুঁয়ে ফেলে তখন বাঁধের স্প্রীলওয়ের ১৬টি গেইটের প্রতিটি ২ফুট, ৪ ফুট অথবা ৬ফুট পর্যন্ত খুলে দেওয়া হতে পারে। কখনো কখনো পানির চাপ বুঝে ১০ফুট পর্যন্ত খুলে দিয়ে থাকে। লেক থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৮০ হাজার কিউসেক থেকে শুরু করে দুই লাখ কিউসেক পর্যন্ত পানি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ে। (৫লাখ কিউসেক পর্যন্ত পানি ছাড়ার ক্ষমতা রয়েছে) এতে কর্ণফুলী নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। নদীতে তীব্র স্রোত সৃষ্টি হয়। চন্দ্রঘোনা ফেরী চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, কাপ্তাই লেকের নিম্নাঞ্চল রাঙ্গুনিয়া, রাউজান,. বোয়ালখালী অঞ্চলে নদী ভাঙন সৃষ্টি হয়, পাশাপাশি নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো প্লাবিত হতে পারে। তবে কাপ্তাই লেকের ছেড়ে দেওয়া পানিতে খুব ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে না।
কাপ্তাই বাঁধ ভেঙে গেলে কি হবে?
এবার কাপ্তাই বাঁধ নিয়ে এতোবেশি গুজব রটেছে যে অনেকেই কাপ্তাই বাঁধ ভেঙে যেতে পারে বলেও ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। কিন্তু কাপ্তাই বাঁধ এমন একটি বাঁধ যা আসলে কখনোই ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। কেন নেই- সেই সম্পর্কে কিছু তথ্য দেই-
কাপ্তাই বাঁধের উচ্চতা হচ্ছে ১৫০ ফুট, দৈর্ঘ- ২২০০ ফুট, প্রস্ত- ভিত্তিতে ১৫০ ফুট এবং উপরে ২৫ ফুট (এই ২৫ ফুট একটি দুই লেনের সড়ক, যে পথে গাড়ি চলে)।
দৈর্ঘ-প্রস্ত-উচ্চতার এই ভিত্তির বাইরেও কাপ্তাই বাঁধকে নিরাপদ রাখতে প্রায় ৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা ভিত্তি তৈরি করা আছে।
এছাড়াও বাঁধের উচ্চতা ১৫০ ফুট হলেও পানির উচ্চতা কখনো ১০৯ ফুটের বেশি বাড়তে দেওয়া হয়না। অর্থাত ১০৯ ফুট পানির উচ্চতাকেই বিপদসীমা ধরা হয়। তবুও যদি বিপদ আসে বাঁধের স্প্রীল ওয়ের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে ৫ লক্ষ ৭০ হাজার কিউসেক পানি ছেড়ে দিতে পারে। পানি ছেড়ে বাঁধকে নিরাপদ করা হয়। ফলে এই বাঁধ কখনোই ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা নেই।
তবু যদি ভাঙে কি হবে-?
দৈব দুর্বিপাক বা আল্লাহর হুকুম বলে তো একটা কথা আছে। যে কোন বড় অঘটনে যদি কাপ্তাই বাঁধ ভেঙে যায়. তখন কি হবে? এটা বুঝবার জন্য কাপ্তাই বাঁধ কিভাবে নির্মান হলো সেটা বুঝতে হবে। লুসাই পাহাড় থেকে সৃষ্ট কর্ণফুলী নদীকে ১৯৫৭ সালে কাপ্তাইয়ে বাঁধ দিয়ে দুই ভাগ করে দেওয়া হয়। ফলে কর্ণফুলী নদীর শুরুটা এখন কাপ্তাই থেকেই। আর বাঁধের উপরিভাগ পুরোপুরি কৃত্রিম লেকে পরিণত হয়। অবাক হবেন বাঁথ দেওয়ার ফলে যে লেক সৃষ্টি হয়েছে তার আয়তন ২৯২ বর্গকিলোমিটার। যা প্রায় ঢাকা-চট্টগ্রাম দুরত্বের সমান। যেখানে পুরোটায় পানি রয়েছে। এবার ভাবেন বাঁধ ভেঙে গেলে কি হবে। হতে পারে রাঙ্গুনিয়া থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম শহর ও বন্দর পর্যন্ত পুরোপুরি তলিয়ে যেতে পারে, অথবা পুরোপুরি জলাধারে পরিণত হয়ে যেতে পারে। বিপরীতে কাপ্তাই লেক পুরোটায় ২৯২ কিলোমিটারের নতুন এক রাজ্য বা শহর হয়ে উঠতে পারে। এগুলো আসলে আপেক্ষিক বিষয় এবং অবাস্তব। সুতারাং কাপ্তাই বাঁধ নিয়ে শঙ্কিত হবার কোন কারণ নেই।
আমার দেওয়া তথ্য কেন বিশ্বাস করবেন- কারণ
আজকের বন্যা পরিস্থিতিতে পানির উচ্চতা বা পানি ছেড়ে দেওয়া না দেওয়া বিষয়ের সব তথ্য আমি বাঁধ কর্তৃপক্ষ বা কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে কথা বলেই উল্লেখ করেছি। কথা বলেছি প্রতি ঘন্টায় যিনি পানির উচ্চতা বা পরিমাপের হিসেব রাখেন তার সাথেও।
বাকি- কাপ্তাই লেকের আচরণ বা তার অতীত বিশ্লেষন কিভাবে করেছি যদি প্রশ্ন করেন তাহলে উত্তর হলো কাপ্তাই লেকের ধারেই জন্ম বড় হওয়া। বলতে গেলে কাপ্তাই লেক, কাপ্তাই বাঁধকে পড়তে পড়তেই বড় হয়েছি। এই বাঁধকে নিয়ে লিখতে লিখতেই সংবাদকর্মী হয়ে উঠেছি। বুদ্ধি হওয়ার পর অন্তত ৩০ বছর ধরে দেখিছি কাপ্তাই লেক, কাপ্তাই বাঁধের আচরণ-বিচরণ। এছাড়া আপনার এই তথ্যসমূহ যাছাই করার জন্য গুগল মামা তো আছেনই।
কাপ্তাই লেকের এই চমৎকার ছবিটা তোলেছেন মো রেজাউল করিম ।
এতোক্ষণ ধর্য্য ধরে এতো বড় লেখা পড়ার জন্য ধন্যবাদ।