05/03/2020
করোনাভাইরাস এখন রীতিমতো একটা আতংকের নাম।
সত্তরটি দেশের প্রায় লাখ খানেক মানুষ ইতিমধ্যে এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তিন হাজারের বেশী মানুষ মৃত্যু বরণ করেছে।
এখনো কোন ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত না হওয়ায় এর সংক্রমণ থেকে মুক্তি পাওয়ার শর্টকাট কোন রাস্তা নেই।
এখনো আমরা শুনিনি কিন্তু আমি অনেকটাই নিশ্চিত আমরা যে কোন দিন শুনবো বাংলাদেশে কেউ আক্রান্ত হয়েছে কিংবা মৃত্যু বরণ করেছে।
আর এই ভাইরাস একবার এদেশে প্রবেশ করলে খুবই দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কেন?
একেবারে সহজ কারণটি হলো জাতি হিসেবে আমরা কিছুটা অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্ন আর নোংরাই বটে।
হ্যাঁ, শুনতে খারাপ লাগতে পারে, মন খারাপ হতে পারে, তবে কথাটা সত্য, বেমালুম সত্য।
শহরের ভালো কোন আবাসিক এলাকার রাস্তা খেয়াল করলে দেখবেন, শুধু থুতু আর থুতু!
অবিশ্বাস্য ঠেকতে পারে কিন্তু শতভাগ সত্য।
সেই থুতু দেখে আমাদের আরো থুতু আসে।
থুথুই থুতুই সয়লাব পুরো দেশ :(
আর কাশি, কফ ইত্যাদি আমাদের তো লেগেই আছে।
হ্যাঁ, আমরা কোনভাবে একবার করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে সেটা পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়বে আমাদের এসব নোংরা অভ্যাসের কারণে।
আর কে না জানে, আমরা হলাম বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। এটাও সংক্রমণের একটা বড় একটা কারণ হতে পারে।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে হলে ফেসমাস্কের চেয়ে জরুরী হলো ঘনঘন হাত ধোয়া আর ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।
আর হাত দিয়ে মুখ, নাক, চোখ ইত্যাদি স্পর্শ করা যাবেনা।
করোনাভাইরাস আসলে বাতাসে উড়ে বেড়াতে পারেনা। করোনাভাইরাস আক্রান্ত কোন রোগী যদি আপনার একেবারে মুখের উপরে হাঁচি না দেয় বা আপনার মুখে কোনভাবে কফ না ফেলে তবে রোগীর সাথে সামনা সামনি কথা বললে বা পাবলিক প্লেসে হেঁটে গেলে ভাইরাস উড়ে গিয়ে আপনাকে আক্রান্ত করবেনা।
তাহলে কিভাবে করোনা ভাইরাস ছড়ায় এবং তার সাথে হাত ধোয়ার কি সম্পর্ক ?
বাতাসে উড়তে না পারার কারনে, আক্রান্ত রোগী থেকে ঝড়ে পরে করোনাভাইরাস ঐ রোগীর পাশে মাটিতে/ টেবিলে / চেয়ারে/ রেলিং / কম্পিউটারের কি বোর্ডে/ পাবলিক টয়লেটের হ্যান্ডেলে / দরজায়/ দরজার হ্যান্ডেলে/ রাস্তায়/ ফাস্ট ফুড চেইনে/খুচরা টাকা এবং কয়েনে এমন কি করিডোরে বা যে কোন উন্মুক্ত অঞ্চলে মাটিতে পরে থাকতে পারে।
যখন কোন ব্যক্তি এই উন্মুক্ত অংশ গুলো হাত দিয়ে স্পর্শ করে তখন ভাইরাসটি তার হাতে লেগে যায়। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ভাইরাসটিকে আপনার মুখ বা নাক দিয়ে আপনার শরীরে প্রবেশ করতে হবে। ফলে কোন ব্যক্তি যদি সেই ভাইরাস লেগে থাকা কোন কিছু স্পর্শ করে নিজের মুখে হাত দেয় তবে, সেই ভাইরাস তার চোখ, নাখ এবং মুখের মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ পায়।
এমনকি পাবলিক প্লেসে আপনার জুতা থেকে আপনার হাতে এবং তারপরে মুখে লেগে সংক্রমণ হতে পারে।
তাই বলা হচ্ছে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সব চেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি হচ্ছে হাত ধোয়া।
এবং এমন ভাবে হাত ধোয়া যেন হাতের আঙ্গুলের গর্তে, নখ এবং আঙ্গুলের মাঝের কানায় কোঁচায় সব স্থানে ঘষে ঘষে সাবান দিয়ে বা স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করা হয়।
এবং আবারো বলি, সবচেয়ে জরুরী হলো হাত দিয়ে মুখ স্পর্শ না করা।
তবে ফেস মাস্কে একেবারেই কাজ হয় না, তা ঠিক নয়। ফেসমাস্ক আপনার নিজের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবে। আর এই ফেসমাস্ক সবচেয়ে জরুরী হলো তাদের জন্য যারা অলরেডি করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। এসব রোগীরা মাস্ক পরে থাকলে বাকীরা কিছুটা হলেও নিরাপদ থাকবে।
আর বিশেষজ্ঞরা হাত ধোয়ার, মুখ স্পর্শ না করার, মাস্ক পরার, এবং পাবলিক প্লেসে উন্মুক্ত জিনিষ স্পর্শ না করা, ঘরের বাহিরে জুতো খুলে, তারপরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ঘরে প্রবেশ করার যে পরামর্শ দিয়েছেন সে সকল পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
বিশেষত হাত ধোয়ার সময়ে সাবান দিয়ে বা স্যানিটাইজার দিয়ে আঙ্গুলের কোনায় কোনায় বিশেষত নখের কোনায় ঘষে ঘষে ধুতে হবে। হাত দিয়ে মুখ স্পর্শ করা যাবেনা।
আমি, একজন মানুষ, ব্যক্তি পর্যায়ে কী কী ব্যবস্থা নিতে পারেন, সে ব্যাপারে কিছু বলছি।
এই করোনাভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত হলে, সাধারণ ফ্লু এর মতোই, জ্বর গায়ে ব্যথা, হাঁচি কাশি, শ্বাসকষ্ট এগুলো হবে।
খুবই ছোঁয়াচে এ ভাইরাসটি। হাঁচি-কাশি, থুতু, কফ - এসবের মাধ্যমে ছড়ায় এটি। সাধারণ ফ্লু এর সাথে এটির পার্থক্য হলো যে, এটিতে রোগীর মৃত্যুহার সাধারণ ফ্লু থেকে ২০গুণ বেশি ।
তবে আশার কথা হলো এই যে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের, শতকরা ৯৮ জন সুস্থ হয়ে যান। এর এখনো কোন টিকা তৈরি হয়নি। সবকিছু ঠিক থাকলে, আগামী দেড় বছরের মধ্যে এর টিকা, পাওয়া যেতে পারে।
আর সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের যা করণীয় তা হল:
১) সাবান দিয়ে হাত না ধুয়ে, কোন অবস্থাতেই তা চোখ, নাক বা, মুখে লাগাবেন না ।
২) জরুরী কাজ না থাকলে বাসায় থাকুন।
৩) বাইরে যাওয়ার আগে এবং বাইরে থেকে ঘরে ফিরে, প্রথমেই সাবান-পানি দিয়ে হাত-মুখ পরিষ্কার করুন।
৪) হাঁচি কাশি আসলে টিস্যু বা রুমাল দিয়ে নাক মুখ ঢেকে হাঁচি বা কাশি দিন এবং তারপরই প্রথম সুযোগে সাবান পানি দিয়ে নিজের হাত মুখ ধুয়ে ফেলুন।
৫) আপনার কাছাকাছি অন্য কেউ হাঁচি বা কাশি দিলে, প্রথম সুযোগে, সাবান পানি দিয়ে নিজের হাত মুখ ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
৬) সব রকমের জনসমাবেশ যেমন, মিটিং মিছিল, মেজবান, ওরশ, দাওয়াত, পার্টি, পারতপক্ষে এড়িয়ে চলুন।
৭) শিশু, বৃদ্ধ, ডায়াবেটিক রোগী, ফুসফুস, কিডনি বা, হার্টের কোন জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, ক্যান্সার রোগী, কেমোথেরাপি পাচ্ছেন এমন রোগী, অবশ্যই বাসার ভেতরে থাকার চেষ্টা করবেন এবং সর্দি-কাশির রোগী থেকে দূরে থাকবেন।
৮) আপনি যদি দেখেন যে, আপনার অথবা, আপনার পরিবারের কোন সদস্য, জ্বর, গায়ে ব্যথা, হাঁচি কাশি এবং শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত, তাহলে নিজেকে বা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে, পরিবারের বাকি সব সদস্য থেকে আলাদা করে ফেলবেন, তাকে মাস্ক পড়াবেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
৯) সারাদেশে যেসব ধরনের মাস্ক পড়ে বিভিন্ন মানুষজনকে ঘুরতে দেখি, আপনাদের জ্ঞাতার্থে বলে রাখি, এসব মাস্ক আপনাকে(যে রোগী নয়) কোন সুরক্ষা দিবে না। বরং, 'আপনি এই ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত আছেন' এই ভুল ধারণার কারণে, আপনি আরো সহজে এটি দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন। সুতরাং, আক্রান্ত ব্যক্তি ছাড়া, বাকিদের মাস্ক পড়া, অতটা জরুরী নয়।
বরং এই মাস্ক মুখের ঠিক জায়গায় রাখতে গিয়ে বারবার মুখে হাত দিতে পারেন, ফলে বিপদ আরো বাড়তে পারে।
১০) খাবার যথাযথ ভাবে রান্না/সিদ্ধ করে খাবেন।
১১) নিজের কর্ম ক্ষেত্রে কিংবা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, কাউকে যদি জ্বর গায়ে ব্যথা এবং হাঁচি-কাশি নিয়ে উপস্থিত হতে দেখেন, তবে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন এবং, তার চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, নিজেদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তাও নিশ্চিত করুন।
১২) পরিচিতদের সাথে দেখা হলে, হ্যান্ডশেক করা বা জড়িয়ে ধরা, এড়িয়ে চলুন । সালাম, নমস্কার, বা আদবের সাথে মাথা ঝুঁকিয়ে শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে পারেন।
১৩) সিঁড়ি, বারান্দা, এস্কেলেটর এর রেলিং বা লিফট এর দরজা ধরলে, প্রথম সুযোগেই সাবান পানিতে হাত ধুবেন বা হ্যান্ভ স্যানিটাইজার ব্যবহার করবেন।
পুনশ্চ
এই লেখাটির বিভিন্ন তথ্য, উপাত্ত ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত। এর বাইরে জিয়া হাছান ভাই আর Abdus S Alim এর স্ট্যাটাস থেকেও অনেক কিছু বিশেষত করণীয় সম্পর্কিত বিষয়গুলো নেয়া হয়েছে।
সবাই সচেতন হই, ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখি।
আল্লাহর ওয়াস্তে যেখানে সেখানে থুতু, কফ ইত্যাদি না ফেলি।
আর যখন তখন মুখে হাত না দিই। আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এটা খুবই কঠিন একটা কাজ।
দেখুন আপনি এই স্ট্যাটাস পড়তে পড়তেই অনেকবার মুখে হাত দিয়েছেন :(
আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ভয়াবহ ভাইরাস থেকে নিরাপদ রাখুন।
আমীন।