28/07/2026
দুদকের মামলায় অভিযুক্ত হয়েও রেলে পদোন্নতি পেলেন দুই কর্মকর্তা, নেই কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা!
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় আসামি হওয়ার পরও বাংলাদেশ রেলওয়ের দুই কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদ ও মো. আনোয়ারুল ইসলামকে কেবল বহালই রাখা হয়নি, উল্টো দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি এবং পছন্দমতো পোস্টিং। সরকারি কোষাগার থেকে কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় রেল অঙ্গনে চরম বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ১৯ জুন এই দুই কর্মকর্তাকে উচ্চ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। দুদকের দায়ের করা পৃথক দুটি মামলার এজাহারে নাম থাকা সত্ত্বেও তাদের এই পদোন্নতি দেওয়া হয়।
ফরিদ আহমেদ: সরকারি রেল পরিদর্শক পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে মহাব্যবস্থাপক (পশ্চিম) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
মো. আনোয়ারুল ইসলাম: সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পূর্ব) থেকে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পশ্চিম) পদে বদলি ও নিয়োগ পেয়েছেন।
মামলার প্রেক্ষাপট ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
রেলের দরপত্র ও কেনাকাটায় ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ, ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গত ১৮ সেপ্টেম্বর (২০২৪) দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১ এ বাদী হয়ে দুটি মামলা দায়ের করেন দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আহসানুল কবীর পলাশ।
প্রথম মামলার (নং- চট্টগ্রাম: ৩৩১০০, তারিখ- ১৭/০৯/২০২৪) প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে নাম রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক ফরিদ আহমেদের। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং পিপিআর-২০০৮-এর ধারা লঙ্ঘন করে মালামাল সরবরাহ না করেই সরকারের ১ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
দুদকের অনুসন্ধান ও মামলা দায়েরের পরও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের লাভজনক পদে বহাল রাখা হয়েছে। এমনকি তদন্তের স্বার্থে তাদের পাসপোর্ট জব্দ, ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ অথবা বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো কোনো প্রাথমিক পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। এই নিষ্ক্রিয়তা জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
রেলওয়ের সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের মতে, "কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সবই মাফ।" নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা হতাশা ব্যক্ত করে বলেন,
"কতশত মামলা হলো, কোনো কর্মকর্তাকে কি কখনো শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে? এসব আসলে সবই আইওয়াশ।"
চলমান মামলায় পদোন্নতির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বচ্ছ রেলব্যবস্থার জন্য সোচ্চার মোহাম্মদ হোসেন বলেনঃ "দুদকের মামলা বা চার্জশিট চলমান থাকা অবস্থায় সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া যায় না। সরকারি চাকরি আইন ও পদোন্নতি বিধিমালা অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক দায়েরকৃত মামলায় চার্জশিট দাখিল বা বিচারাধীন থাকলে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কোনোভাবেই পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হতে পারেন না।"
বিষয়টি নিশ্চিত করে রেলওয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) মামলা চলমান থাকার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে নোট দেওয়া থাকে। মামলা নিষ্পত্তি হলে তবেই কেউ পদোন্নতি পেতে পারেন; কিন্তু মামলা চলমান অবস্থায় পদোন্নতি পাওয়ার কোনো আইনগত সুযোগ নেই।
দুদকের মামলা থাকার পরও কীভাবে এই কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হলো এবং কেন তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।