01/12/2025
✨ NAMASTHE অন্নপূর্ণা ✨
🇳🇵🇮🇳🇨🇳🇧🇩🇰🇷🇯🇵🇪🇸🇫🇷🇺🇦🇷🇺🇧🇪🇵🇹🇵🇸🇮🇱🇬🇧🇺🇸🇨🇦🇩🇪🇧🇷🇭🇰🇸🇪
ব্যাম্বো পথে :
পর্ব ২
রাতে খুব বৃষ্টি হলেও ভোরে বাইরে বেরিয়ে বুঝলাম মেঘ কেটেছে আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে, দূরে কিছু সাদা বরফ চূড়া দেখা যাচ্ছে। মেঘের ভেলায় ভেসে আরামসে পৌঁছে যাওয়া যাবে ওই বরফ চূড়ায়, ছোট্ট বাচ্চা যেমন মায়ের চারদিকে ঘুরে ঘুরে খেলতে থাকে ঠিক যেন সেরকমই অন্নপূর্ণা সাউথ, ফিসটেলের চূড়ায় মেঘেদের আনাগোনা। ঠান্ডা নেই খুব বেশি CHHOMRONG-এ, কাল রাতের পর আর এক দফা স্নান করে নিলাম বাকিরা করলো না বলল উপরে করবে। প্রাতঃরাশ পর্ব ছিল বেশ বড় সাইজের মাঝবরাবর কাটা ময়দার পুরি আর মটরছোলার তরকারি দিয়ে, ডিম সেদ্ধও ছিল সাথে একটা করে। এখানে তিক হলো লাগেজ ব্যাগের ওজন কমাতে হবে, তাই বেশ কিছুটা ব্যাগ খালি করে রেখে দিলাম এই হোমস্টেতে।
চেক পোস্টে আমাদের পারমিট দেখিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম, একটা কথা এখানে বলে রাখি—এই প্রকৃতির যেমন সৌন্দর্য সেরকমই শান্ত, যেন কোনো অজানা শক্তি নিজের হাতে বানিয়েছে এই প্রাকৃতিক সভ্যতা, তাই সঙ্গে থাকা সাউন্ড বক্সটা জমা দিয়ে যেতে হলো চেক পয়েন্টে। প্রকৃতির নিজের বানানো মিউজিকের কাছে মনে হয় মানুষের সব সৃষ্টির মূল্য নগণ্য। একটানা নেমে চলা পথ, প্রতিটা বড় ল্যান্ডিংয়ে কিছু বাড়ি, দূরে দেখা যাচ্ছে ধাপে ধাপে সাজানো চাষের জমি—শুধুই সবুজ না, এ শুধু একটা সবুজ না বরং বলা যায় সবুজের নানা শাখা-রং, যেন কোনো শিল্পীর হাতের স্পর্শে সেজে ওঠা ক্যানভাস। আরও একটু নিচে লোয়ার Chhomrong গ্রামের শেষ ঢালু মিশেছে নদীতে আর তার পাথরের উপর নেচে নেচে নিচে নেমে যাওয়ার নদীর শব্দের তালে বেশ কিছুটা নয়, অনেকটা নেমে এসে পৌঁছেছি রংবে রঙে সাজানো Chhomrong গুম্ফার ছোট্ট চাতালে। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১০:১০, মনে হলো মাত্র ৩০ মিনিট হেঁটেছি, মানে সিঁড়ি বেয়ে নেমেছি। আরও নিচে একটা চরতেন পার করে আর একটা সাসপেনশন ব্রিজ—এটা আমাদের যাত্রাপথের দ্বিতীয় সেতু।
এবার কিন্তু পুরোটাই ওঠা। Chhomrong গ্রাম এখান থেকে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট ছোট্ট ঘরে সাজানো, আর সিনুয়ারের ঢালের কিছুই দেখা যাচ্ছে না, বোঝার উপায় নেই কতটা উঁচুতে উঠতে হবে। কিছুটা চাষের জমি পরে একটা উঠে যাওয়া সিঁড়ি আর সিঁড়ি। সিঁড়ির ধার বেয়ে গেছে জলের লাইন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও আছে, মাথার উপর দিয়ে রাস্তা বরাবর উপরের দিকে উঠে গেছে। যাকে জিজ্ঞাসা করি সিনুয়া কত দূর আর কতটা হাঁটতে হবে? সেই বলে ১:৩০ ঘণ্টা বা ২ ঘণ্টা। জঙ্গলঘেরা পথে উঠেই যাচ্ছি ধীরে ধীরে। তবে অনেক লোকের যাতায়াত, অনেক নেপালি লোক জঙ্গলের ভিতরে কিছু সংগ্রহ করছে—জানি না সঠিক কী জিনিস, তবে মাথায় বাঁধা ছোট্ট ডোকো (বাঁশের ঝুড়ি)–র মধ্যে কিছু রাখছে। আরো কাছে এসে বুঝলাম বাঁধাকপি, ফুলকপি কিছু হবে। তবে এখানে জিনিসপত্র নিয়ে উপরে উঠছে অনেক কম লোকজন, তবে কিছু পোর্টার আছে যারা বড় করোগেটেড শিট—মানে আমরা যেটাকে টিন বলি—সেরম ২টো করে নিয়ে যাচ্ছে মাথায় করে; কোথাও কোনো বাসা বা হোটেল তৈরি হচ্ছে হবে তারই জিনিস। কিছুটা উঠে একটা ভাঙা প্রাচীর টপকে ঢুকে পড়লাম সিনুয়াতে—এখানে Chhomrong শেষ। তবে এটা সিনুয়া গ্রামের শুরু-শেষ কিভাবে যে হলো সেটাই বলব। এঁকে বেঁকে উঠে চলেছি সিঁড়ির পর সিঁড়ি,ভেবেছিলাম কাউন্ট করব কিন্তু না, সে আর হয়ে ওঠেনি। হেলিপ্যাড যখন পৌঁছালাম তখন বাজে প্রায় ১২টা, তারপর ম্যাপ দেখে বললাম চলো, আর ৩০ মিনিট লাগবে কিন্তু এই ৩০ মিনিটে গ্রামের মুখে পৌঁছালাম। এখানে আমাদের ছোট গ্যাস স্টোভ সেট করে এক বোতল পাহাড়ি জল ভরে নিয়ে এসে চা বসালাম আর খিদেও পাচ্ছিল হালকা হালকা তাই ছাতু বানালাম সবার জন্য। এইসব করতে করতে কখন অনেকটা সময় কেটে গেছে, আবার শুরু করলাম হাঁটা—শুধু উপরে ওঠা। আরো বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে পৌঁছালাম লোয়ার সিনুয়া। সুন্দর সাজানো শান্ত একটা গ্রাম, কিছুটা ব্যস্ত—কিছুক্ষণ আগে আসা হেলিকপ্টার থেকে মালপত্র বিভিন্ন হোটেলে পাঠিয়ে দিতে তৎপর কিছু ছেলে মেয়ের দল। হাতে বেশি সময় ছিল না, তাই থাকতে পারব না এই গ্রামে। সত্যি অবাক লাগে, এই উপরে যেখানে এত প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা, তাও অনেক মানুষ আছেন—এখানে শান্ত, স্বর্গীয় প্রকৃতিতে আপন করে নিয়েছে নিজেকে। না, মায়া বাড়িয়ে বেশি লাভ নেই, সামনে একটা দোকানে কথা বলে বুঝলাম উপরের গ্রামটা আরো সুন্দর আর সাজানো। এখানে বাড়িগুলো একদম পাহাড়ের কিনারে বসানো, জানালা থেকে মুখ বাড়ালে দেখা যাচ্ছে মেঘে ঢাকা খাদ—অনুমান করা যাচ্ছে না তার গভীরতা, সবকটা বসার জায়গা ঝুলন্ত, রেলিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে-বসে আছে উঠা-নামা ট্রেকারের দল। বেশ কিছুক্ষণ আমিও রেলিং ধরে পৌঁছে গেছিলাম প্রকৃতির নিজের দেশে। অমিত আর আমার মেয়ে এগিয়ে গেছে অনেক আগেই, তাই আমি আর শম্পা আবার হাঁটা দিলাম উপরের গ্রাম হয়ে বাম্বোর উদ্দেশ্যে।
উপরের গ্রামটা সত্যি সুন্দর। এখানে এক দোকানে একটু আড্ডা দিচ্ছিলাম এক লোকাল মানুষের সাথে, জানছিলাম এখানকার স্বাভাবিক উদ্ভিদ আর প্রাণীজগৎ সম্পর্কে। এখানে হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার আছে এবং রাতের রাস্তায় দেখা যায়, আর কালোমুখের লেউল ধরনের এক স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে জঙ্গলে। আর পাখির তো নানা রং—এখানে মোনাল আর দেখা যায় না, আগে নাকি অনেক মোনাল দেখা যেত, এছাড়াও অনেক পাখি দেখা যায় এখানে— কোকিল আছে অনেক প্রজাতির, গ্রে ফ্লাইক্যাচার, হলুদ-সবুজ হিমালয়ান বাবলার তো সারাদিনের সঙ্গী—ওরা যেন পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। কিছু সবুজ পায়রা আর মোরগের মত দেখতে চিলেমে নামের এক পাখি দেখা যায়—পরে জেনেছি এটাই Blood Pheasant, তবে খুব কম দেখা যায়। আর হ্যাঁ—মোনাল নেপালের জাতীয় পাখিও বটে।
আমাদের সন্দাকফু–সিঙ্গালিলার রাস্তায় যেমন অ্যালপাইন ফ্লোরা দেখা যায়, সেরম সব প্রজাতি এখানেও উপস্থিত। ঠান্ডা আবহাওয়ায় কম পরিমাণ মাটিতে এরা বেড়ে ওঠে। প্রিমুলা যেমন একটি ছোট্ট গাছ, এরম হলুদ আর সাদা ফুলের গাছও দেখা যায় এখানে। তবে সিনুয়াতে বড় গাছের জঙ্গল বেশি—ওক, রডোডেনড্রন আর বাঁশের নানা প্রজাতি চোখে পড়ার মত এই পথে। উচ্চতা ২৩৪০ মিটার—ঠান্ডা এখন সেরম না থাকলেও বেশ ভালো ঠান্ডা পড়ে এখানে সেটা এখানকার স্বাভাবিক উদ্ভিদ দেখলেই বোঝা যায়, আর বৃষ্টিও হয় ভালই—সমস্ত গাছের গায়ে জন্মেছে ফার্ন। আমরা যে লাল রডোডেনড্রন আগে দেখেছি, তা নেপালিতে ‘লালি গুরান’ বলে—এটাই এদের জাতীয় ফুল, তবে আমরা দেখিনি কারণ এটা সেপ্টেম্বর। আরো নাকি ৩০ প্রজাতির রডোডেনড্রন এই অঞ্চলে জন্মায়। আড্ডা অনেক দেওয়া হয়ে গেছে, তাই নমস্তে বলে এগিয়ে চললাম বাম্বোর উদ্দেশ্যে। উপরের গ্রাম পেরোনোর পর আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু হলো—মেঘে ঢেকে গেছে পাহাড় আর এই বনানী।
পাহাড়ে মেঘ আসে ঝপ করে, কিন্তু আজ যেন হঠাৎ সন্ধে নেমে এলো বিকেলে। মেঘেদের আনাগোনা বেড়ে গেলো, বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে, পঞ্চু চাপিয়ে নিলাম সবাই। এই পথ কিন্তু খুব একটা খারাপ নয়—চড়াই থাকলেও সেরম একটা নয়, আর সিঁড়িও নেই। পা চালিয়ে এগিয়ে চললাম মেঘেদের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সোজা হেঁটে চলা, অনেকটা ঢালু দেয়ালের গা ধরে হাঁটা—ডান দিকে নেমে গেছে দেয়ালের ঢাল। এ জঙ্গলে বাঁশের জঙ্গল বেশি—নানা জাতের বাঁশের দেখা মিলছে এ পথে, সাথে ওক গাছের বন আছে। মনে হচ্ছে হালকা বৃষ্টি এলো, জঙ্গলের ভিতরে আলো আছে বোঝা যাচ্ছে, তবে খুব কম। কখনও কখনও বৃষ্টির গতি ভালই বাড়ছিল আর আমরা ঝুলে থাকা পাথরের তলায় একটু বিশ্রাম করে আবার হাঁটা শুরু করছিলাম বারবার রাস্তা কিন্তু বেশ অনেকটা—আমরা বাম্বু পৌঁছালাম যখন তখন মেঘ কেটেছে, বিকেলের পড়ন্ত আলো দেখা যাচ্ছে। ঠিক করলাম ডোভান চলে যাব—আর দুটো দল ছিল আমাদের সাথেই, ওরাও চলে যাবে বলল। দোভান উঠতে বেশি কষ্ট নেই,এখান থেকে নাকি একটু খানি রাস্তা চড়াইও নয়, ঘণ্টা ২ লাগবে ম্যাক্সিমাম। একটু চা না খেয়ে আর যাওয়া যাবে না—ভিজেছি তাই ঠান্ডা লাগছে। চা খেতে গিয়ে আমরা ৩০ মিনিট লাগিয়ে দেবো বুঝিনি, বাকিরা এগিয়ে গেছে অনেকটা। তড়িঘড়ি ব্যাগ চাপলাম পিঠে, কিন্তু জঙ্গল ঘন থেকে আরো ঘন হয়ে গেলো। মিনিট ১৫ ওঠার পর বুঝলাম আমরা ভুল করছি, আর ১০ মিনিট পর শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি আর আকাশে মেঘের গর্জন। তবে মেঘের আওয়াজ আসছিল অনেক নিচে থেকে। সামনে–পিছনে–উপর–নিচ কোথাও কোনো আলোর রেখাটুকুও নেই, শুধু আমাদের হাতে ধরা আলো ছাড়া আর দূরে নিচে বিদ্যুৎ চমকানোর আলো এটুকুই আলোর উৎস। এই অচেনা পথে এই দৃশ্য ভোলার নয়। অনেকেই বিদ্যুৎ দেখেছি আকাশে—উপরের দিকে তাকিয়ে, এখন আমরা দেখছি নিচে। একবার হাতের আলো বন্ধ করলে পাশের হাতে ধরা মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছি না,মনে হচ্ছিল অন্ধ মানুষের জীবন। কোনটা পথ, কোনটা উপর থেকে নেমে আসা নদী–ঝোরা কিছুই ঠাওর করতে পারছি না আমি একসময়,মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে কান খাড়া করে এগিয়ে চলেছি—কান খাড়া সবার। এই পথে কিন্তু ভল্লুক দেখা যায় শুনেছি আগেই, জানি না লেপার্ড আছে কি না—কিছু থাকা অসম্ভব নয়।
প্রায় ৩০ মিনিট হাঁটার পর উপর থেকে নেমে আসা এক নেপালি দম্পতি পেলাম—ওরাও বাম্বু নামছে। জিজ্ঞাসা করলো, কতটা নামতে হবে। আমরা ৩০ মিনিট বলে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু কি মনে হলো জিজ্ঞাসা করলাম—আমাদের আর কতদূর যেতে হবে দোভান পৌঁছাতে? ক্লান্ত–চিন্তিত–হতাশভাবে মহিলা বলল—জানি না। কিন্তু সেই আঁধারে বুঝলাম তার উত্তর দেবার ইচ্ছা আছে, কিন্তু কেমন যেন পাগল–পাগল তার কথা—আর ওনার সাথে যিনি ছিলেন তিনি কোনো কথা বলতেই পারলেন না। যাই হোক, এই ক্রমবর্ধমান আঁধার পথের কথা ভোলার নয় কোনোদিন, হওয়া বৃষ্টি আর নদীর শব্দ ছাড়া কিছুই কানে আসছিল না। রাত কত কালো হতে পারে সত্যি কোনোদিন অনুভব করিনি আগে,আজ আরও অনুভব করলাম—যতই কষ্ট থাক, প্রয়োজনের কাছে আমরা সবাই অধিক পরিশ্রমী। অমিত পায়ের দিকে, কম জঙ্গলের ভিতর দিকে আলো ফেলে কি যেন খুঁজেই যাচ্ছে—ইচ্ছা থাকলেও কোনো প্রশ্ন ওকে ঐ রাতে করিনি। আর শম্পাকে দেখলাম—ও কত সিরিয়াস হয়ে গেছে। আর আমার মেয়ের মতো ভালো মেয়ে যেন পৃথিবীতে কেউ নেই এই রাতে। হ্যাঁ, আমি রাত লিখছি বার বার কিন্তু ঘড়ির কাঁটা তখন মাত্র ৭টা ছুঁয়েছে। হেঁটে যাওয়া ছাড়া যখন আর কোনো কাজ নেই, কোনো উপায় নেই—কর্মধর্ম শুধুই হাঁটা—উদ্দেশ্য একটাই, একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই। প্রায় ২ ঘণ্টার পর একটা সরু বাঁকের শেষে অমিত হঠাৎ বলে উঠলো—“এসে গেছি! লাইট দেখা যাচ্ছে!” আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। তারপর শম্পা বলল—হ্যাঁ, Dovan লেখা আছে।