04/01/2026
হিমের আঁচলে হিমাচল :
পর্বতের রাজা হিমালয় যেখানে দেবতাদের বাস। তারই মধ্যে হিমের আঁচলে মোরা হিমাচল অন্যতম । বরাবরই পাহাড়ি ফুলের গন্ধ ,অচেনা অচেনা ঝরনার বেহিসাবি স্রোত ,দুর্গম আঁকাবাঁকা পথ আমাদের টানে ।তাই মাসখানেক আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। ঠিক হয়েছিল মে মাসের গোড়াতেই রওনা দেব হিমাচলে ,তাই নিয়মমাফিক ৬০ দিনের ব্যবধানে ট্রেনের টিকিট কাটা ও হোটেল গাড়ির প্রি বুকিং সব করে ফেলি ফেব্রুয়ারি মার্চের মধ্যেই। হিমাচলের পরিধি অনেকটাই ,সীমিত সময়ে সবটুকু ছুঁয়ে যাওয়া মোটেই সম্ভব নয় তাই আমরা বেছে নিলাম সেরা সেরা কিছু স্পট ।ঠিক হলো শুরু করব সিমলা থেকে আর সিমলা বলতে সবার প্রথম যা মনে আসে তা হল টয়ট্রেন। খোঁজ নিয়ে দেখলাম কালকা স্টেশন থেকে ভোর তিনটে থেকে শুরু করে বেশ কিছু সময়ের ব্যবধানে বেশ কয়েকটা টয় ট্রেন ছাড়ে । হাওড়া থেকে কালকা যাওয়ার জন্য একমাত্র ট্রেন নেতাজি এক্সপ্রেস যা পূর্বে কালকা মেল নামে পরিচিত ছিল রাত নটা ৪৫ এ হাওড়া থেকে ছেড়ে ৩৬ থেকে ৪০ ঘন্টা পর ভোর তিনটেয় কালকা স্টেশনে পৌঁছায় । তাই সেই সময়ের কথা মাথায় রেখে আমরা কালকা থেকে ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশের টয় ট্রেনের টিকিট কাটি। বিশেষত এই টয় ট্রেনটি বাকিগুলোর থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা, ৫২৪৫১ শিবালিক এক্সপ্রেস অর্থাৎ আমাদের টয়ট্রেন সবচেয়ে প্রাচীন টয়ট্রেন হওয়ায় হেরিটেজের তকমাপ্রাপ্ত ( ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ )। ১৯০৩ সালে প্রথম এই টয় ট্রেনের চাকা গড়ায় প্রায় ৮৬ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রমের উদ্দেশ্যে । কালকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২১৫২ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ,সেখান থেকে যাত্রা শুরু করে এই ট্রেন সিমলায় পৌঁছায় ৬৮০০ ফুট উচ্চতায় প্রায় চার থেকে সাড়ে চার ঘন্টা পর। যাত্রা পথে পড়ে ২৫৬ টি রেলওয়ে কমপ্লেক্স ব্রিজ , ১০২ টি টানেল ও ৯১৭ টি পাহাড়ি বাঁক। এই টয় ট্রেনের টিকিট কাটা জার্নির তারিখের ঠিক একমাস আগে শুরু হয়। টয় ট্রেনের এই জার্নি যতটা মনোমুগ্ধকর ততটাই বিলাসিতায় ভরা । ট্রেনের সিটগুলোকে ৩৬০ ডিগ্রী ঘোড়ানো সম্ভব যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ের প্রতিটা বাঁকের সৌন্দর্যকে চেটেপুটে নেওয়ার জন্য। সফর শুরুর সাথে সাথেই হাতে চলে আসে স্থানীয় সংবাদপত্র ও জলের বোতল । বেশ কিছুটা পথ চলার পরই আমাদের দেওয়া হয় চা তৈরির নানা রকম সরঞ্জাম আর এক কাপ গরম জল । হাতে তখন গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ সাথে মেরি বিস্কুট আর বড় কাঁচের জানালার বাইরে হিমশীতল পরিবেশে হিমাচলের পাহাড়ি খাদ । এ যেন এক নৈসর্গিক অনুভূতি । যাত্রা পথের যখন আর এক ঘন্টা বাকি তখন হাতে চলে আসে পাউরুটি , ডবল ডিমের অমলেট , বয়েল্ড ভেজিটেবিল আর তার সাথে টমেটো সস এর পাউচ প্যাকেট । ঠিক এতটা আশা করিনি আমরা । এত সুন্দর পরিবেশে এত মনোরম আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ হয়ে ছিলাম। ধরমপুর, কুমারহাট্টি, বারোগ ,সোলান হয়ে মোট ১০ টা অপূর্ব পাহাড়ি স্টেশন পেরিয়ে সকাল দশটা নাগাদ পৌঁছায় সিমলা, ঝা চকচকে স্টেশনে টুকটাক কটা ছবি তুলে নিয়ে কিছুটা খাড়াই পথ চলে স্টেশনের বাইরে এসে দেখি গাড়ির লাইন। স্টেশন থেকে শিমলা ম্যাল পর্যন্ত পথ দেড় থেকে দুই কিলোমিটার। কিন্তু ওইটুকু পথ এতটাই চড়াই যে ব্যাগ পত্র নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব । তাই নির্দিষ্ট ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে নিলাম আমরা ম্যাল পর্যন্ত যাওয়ার জন্য , ভাড়া নিল ৩০০ টাকা। গাড়ি যেখানে আমাদের নামালো সেখান থেকে মোটামুটি ৫০০ মিটার পথ হেঁটে পৌঁছালাম হোটেলে । সিমলায় হোটেলের অভাব নেই তাই হোটেলের বিবরণ দিয়ে আর সময় নষ্ট করলাম না । হোটেলে লাঞ্চের অর্ডার দিয়ে স্নান সেরে নিলাম আমরা। দুপুরের মেনুতে ছিল ফ্রাইড রাইস চিলি চিকেন যা তখন আমরা গোগ্রাসে শেষ করে ফেলি নিমেষে । বিকেলে বেরিয়ে পড়ি সিমলার ম্যাল আর বিখ্যাত কালীবাড়ি দেখতে । তখন বাজে সন্ধ্যে সাতটা তবে সেই সময়ও গোটা সিমলার আকাশে দাপটে সূয্যিমামা ব্যাটিং করছে। ঠিক সাতটা নাগাদ সিমলা কালীবাড়িতে সন্ধ্যা আরতি হয় যার স্বর্গীয় অনুভূতি চিরকাল মনে থাকবে । পাহাড়ের প্রতিটা কোনায় কালিবাড়ির ঘন্টার প্রতিধ্বনি এক আলাদা পরিবেশ তৈরি করে । বলে রাখি এই কালীবাড়িতে নামমাত্র খরচায় থাকা ও খাবার ব্যবস্থা রয়েছে। খাদ্য তালিকায় মাছ, ডিম, মাংস সবই আছে এবং নিরামিষ থালিতে মিল সিস্টেমে খাওয়া দাওয়া হয়। বাঙ্গালীদের আনাগোনা লেগেই থাকে সবসময় কালীবাড়িতে । কালিবাড়ির বারান্দা থেকে সূর্যাস্ত দেখার পর সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষে চলে যায় । ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসে সিমলার রাস্তায়। হেঁটে এগোতে থাকি ম্যাল মার্কেটের দিকে । পথে পাবেন ব্রিটিশ স্থাপত্যের একের পর এক নিদর্শন যা বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর অথবা মিউজিয়াম । মায়াবী আলোয় মোড়ানো গোটা ম্যাল রোডে নামজাদা ব্র্যান্ডের হরেক দোকানের ছড়াছড়ি ।গোটা চত্বরটায় খুঁজে পেলাম না দার্জিলিং এর মত রাস্তার ধারে মোমো বা পাহাড়ি খাবারের দোকান । ম্যালের শেষপ্রান্তে বিখ্যাত সিমলার চার্চ আলো আঁধারীতে চমৎকার লাগছিল । উত্তর ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীন চার্জ এটি যেখানে বিখ্যাত চলচ্চিত্র 3 idiots এর শুটিং হয়েছিল। রাত তখন নটা, ধীরে ধীরে সমস্ত বড় দোকান বন্ধ হয়ে যায় ওই সময়। পেলাম ছোট্ট একটা আইসক্রিমের দোকান। জানলাম ওখানে হিমাচল এর একটা বিশেষ খাবার পাওয়া যায় যার নাম সিড্ডু। বিভিন্ন রকম বাদাম এবং ডাল বেটে একটা পুর বানিয়ে মোমোর আকারে গরম গরম দেওয়া হয় গাওয়া ঘি মাখিয়ে । আজও সেই স্বাদ আমাদের মুখে লেগে আছে। রাতে স্থানীয় একটা দোকানে রুটি আর তরকা দিয়ে ডিনার সেরে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম সেদিনের মত। তবে এখানে খাবারের দাম একটু বেশি। পরদিন ভোরবেলা আমাদের আগে থেকে রিজার্ভ করা গাড়ি চলে আসে । পাহাড়ি অলিগলি দিয়ে হেঁটে অনেকটা পথ যাওয়ার পরে দেখা মিলল সেই গাড়ির, কারণ ম্যালের কাছে কখনোই কোনো গাড়ির প্রবেশের অনুমতি থাকে না । আজ আমরা সিমলার কিছু পরিচিত ট্যুরিস্ট স্পট দেখব। প্রথমেই গ্রিন ভ্যালি দিয়ে শুরু করলাম। রাস্তার ধারেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে পাইন গাছে ঢাকা পাহাড়ি উপত্যকা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। বেশ কিছু ছবি ক্যামেরাবন্দি করে বেশি সময় নষ্ট না করে আমরা পা বাড়ালাম কুফরির উদ্দেশ্যে। হিন্দুস্থান টিবেট রোড যা NH5 নামে পরিচিত সেই রাস্তা ধরে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পৌছালাম কুফরিতে।‘কুর্ফ’ কথার অর্থ লেক, ৭৫০০ ফুট উপরে সিমলা জেলার সর্বোচ্চ উপত্যকা এই কুফরি যেখানে দেখা যায় একটি মন্দির , সুন্দর একটি লেক , আপেল বাগান আর অনেক ফাস্টফুডের দোকান । তবে গাড়ি আমাদের যেখানে নামালো সেখান থেকে কুফরি ভিউ পয়েন্ট পর্যন্ত যেতে হয় ঘোড়ায় চড়ে । গাড়ির ব্যবস্থা আছে তবে তার রেট একটু বেশি। ঘোড়ায় চড়ার লোভ সামলাতে না পেরে ঘোড়ায় উঠে বসলাম সবাই। প্রায় তিন কিলোমিটার পথ ঘোড়ায় যাওয়া এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়ে মনে থাকবে সব সময়। সরু পাহাড়ি খাদের রাস্তা আর ঘোড়ার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী খাদের ধার দিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কি সাংঘাতিক ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল মনে তা বলে বোঝানো যাবে না । গাড়ির ভাড়া দেড় থেকে দুই হাজার টাকা তবে স্থানীয় লোকেদের সাথে দামাদামি করতে যাবেন না, তর্ক বাড়বে ছাড়া কোন লাভ হবে না । ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে ঘুরে এসে এগোলাম পরবর্তী গন্তব্যে ,যা ছিল কুফরি চিড়িয়াখানা, ভারতের সর্বোচ্চ চিড়িয়াখানা এটি যা হিমালয়ান নেচার পার্ক নামে পরিচিত । চিতা বাঘ থেকে শুরু করে হিমালয়ান সাম্বার, ব্রাউন এবং ব্ল্যাক বিয়ার , হিমালয়ান থার ও আরো অনেক পশুপাখিতে ভরা এই চিড়িয়াখানার ভেতরটা খুব সুন্দর সাজানো । বলা হয়নি এই চিড়িয়াখানার এন্ট্রি ফি ৬০ টাকা। বিকেল হয়ে যায় চিড়িয়াখানা থেকে বেরোতে। আর যে স্পটগুলো সিমলার আপনারা দেখতে পারেন তার মধ্যে জাকু মন্দির অন্যতম আকর্ষণ । কথিত আছে মেঘনাথ যখন লক্ষণকে তীর মারেন তখন সঞ্জীবনী গাছের সন্ধানে হনুমান হিমালয় এসে এখানে বিশ্রাম নেন । এছাড়াও ঘুরে দেখতে পারেন লক্কর বাজার , তারা দেবীর মন্দির ইত্যাদি।
পরদিন সকাল সকাল সিমলার পাট চুকিয়ে আমাদের রিজার্ভ গাড়িতে চড়ে বসলাম মানালির উদ্দেশ্যে। প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার পথ এনএইচ ২০৫ ও এনএইচ ৩ ধরে যেতে সময় লাগার কথা প্রায় সাত ঘন্টা। তাই যতটা ভোর ভোর বেড়িয়ে পরা যায় ততই ভালো । চন্ডিগড়ের রাস্তা হয়ে যখন আমরা কুলু পৌছালাম তখন বাজে প্রায় বিকেল চারটে। কুলু প্রধানত বেশ কিছু ওয়াটার স্পোর্টস আর শীতের শালের জন্য বিখ্যাত। বিপাশা নদীর স্রোতে (স্থানীয় নাম বিয়াশ্) গা ভাসিয়ে রিভার রাফটিং অত্যন্ত জনপ্রিয় এখানে। মাথাপিছু খরচ কমবেশি এক হাজার টাকা। দরদাম করা আবশ্যিক তবে জামা কাপড় সব ভিজে যাওয়ার সম্ভাবনা পুরো দমে থাকে তাই রিভার রাফটিং এর ইচ্ছে থাকলে আলাদা জামা সাথে রাখবেন । এছাড়াও হট এয়ার বেলুনে করে খানিকটা আকাশে উড়ে গোটা কুলু শহরটাকে এক ঝলক দেখে নিতেই পারেন, সে ক্ষেত্রেও খরচ সেই হাজার টাকার আশেপাশেই। তবে এগুলোর কোনোটির পথে পা না বাড়িয়ে আমরা সোজা পা বাড়ালাম কুলুর বিখ্যাত শাল তৈরির কারখানায় । মহিলা মহলের আবদার তো থাকেই , সাথে বাড়ির সকলের জন্য কুলুর শাল না নিলে হয় ?তবে আপনারা এখানে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৭০ হাজার টাকার সাল ও পাবেন । শখ ও পকেট বুঝে নিয়ে নিতেই পারেন গুটিকতক শাল । বিকেলে টুক করে একটু বিয়াশ নদীর তটে গিয়ে বেশ কিছুটা ফটো তুলে নিলাম আমরা । ড্রাইভার ভাই তখন তাড়া দিতে শুরু করেছে আমাদের কারণ তখনও মানালি পৌঁছাতে চল্লিশ কিলোমিটার মতো পথ বাকি। মানালিতে একটা হোমস্টে আগে থেকেই বুক করা ছিল আমাদের। যখন পৌঁছালাম ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আটটা ,তবে পাহাড়ের অনেকটা চড়াই উঠে আমাদের হোমস্টে হওয়ায় সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষে উধাও হয়ে যায় যখন আমাদের হোমস্টের বারান্দা থেকে বাইরের বরফে ঘেরা হিমালয় কে হাতের নাগালে পেয়ে গেলাম । পিছনে পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় মোহময়ী দুধ সাদা হিমালয় থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না । গরম গরম চা দিয়ে শুরু করে আর হোমস্টের ডিনার চিকেন আর ধোঁয়া ওঠা ভাত সেই চার ডিগ্রী তাপমাত্রায় যেন অমৃতের সমান ছিল আমাদের কাছে। পরদিন ভোরবেলা আমরা বেরিয়ে পড়লাম মানানির লোকাল সাইটসিনের উদ্দেশ্যে। শুরু করলাম হিড়িম্বা মন্দির দিয়ে। বিখ্যাত রোজা সিনেমার শুটিং স্পট হিসাবে বিখ্যাত এই মন্দির । পান্ডু পুত্র ভীমের স্ত্রী ছিলেন হিড়িম্বা । বর্তমানে যে মন্দিরটি আমরা দেখতে পাই সেটি স্থাপন করেন মহারাজ বাহাদুর সিং ১৫৫৩ সালে । এর পাশে হিড়িম্বা ও ভীমের পুত্র ঘটোৎকচের মন্দিরেও আছে। মন্দির যাওয়ার পথে অনেক কেনাকাটা করার দোকান পাবেন । বেশ সস্তায় মাফলার নিয়ে নিতে পারেন গুটিকতক। এরপর গাড়ির চাকা গড়ালো ওল্ড মানালির উদ্দেশ্যে । ওল্ড মানালির প্রধান আকর্ষণ ক্লাব হাউস । যেখানে হিমাচলের আদি স্বরূপ খুঁজে পাবেন । খরস্রোতা বিপাশা নদীর তীরে ক্লাব হাউসে পাবেন শীতের পোশাকের এক্সিবিশন । আর রয়েছে রেস্তোরাঁ সাথে ইনডোর গেমস এর সুবিধা । বড় বড় খরগোশ কোলে নিয়ে বিপাশা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ভুলবেন না । করে নিতে পারেন রোপ্ জাম্পিং , খরচ মাথাপিছু ৩০০ টাকা । বিকালে চলে গেলাম মানালি ম্যালে। যেখানকার প্রধান আকর্ষণ বনবিহার ও মনেস্ট্রি । চিনা ও ভুটানি মার্কেটে কিনে নিন বাড়ির সবার জন্য শীতের বস্ত্র তবে দরদাম ভালো করে করবেন । পাহাড়ি ফুচকা,গরম মিনি গোলাপজাম অবশ্যই খাবেন আর যেটা ভুলবেন না তা হলো মানালির সেরা আইসক্রিম সফটি।
পরের দিন আমাদের প্ল্যান ছিল রোটাং পাস যাওয়ার তবে এক্ষেত্রে বলে রাখি যেদিন আপনারা রোটাং পাস যাবার পরিকল্পনা করবেন তার আগের দিন পারমিট নিয়ে রাখবেন । আপনার গাড়ির ড্রাইভার সেই দায়িত্ব নিয়ে নেবে ।পারমিটের জন্য খরচ ৫০০ টাকা এবং সেটা গাড়িপিছু, মাথাপিছু নয়। তবে রোটাং পাস যাওয়ার জন্য আপনার রিজার্ভ করা গাড়ি কেও আলাদাভাবে তিন থেকে চার হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হতে পারে। যতটা সকাল সকাল সম্ভব বেরিয়ে পড়বেন রোটাং পাসের উদ্দেশ্যে, গাড়ির লম্বা লাইন হয়ে যায় ভোরবেলা থেকেই। ভোর ভোর পৌঁছে যেতে পারলে বরফের মধ্যে খুব সুন্দর মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করতে পারবেন । মানালি থেকে রোটানের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার মতো , যেতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘন্টা। প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় বরফের ঢাকা পথে যেতে বেশ ভালোই লাগবে। সাধারণত মে মাসের ১৫ তারিখ থেকে রোটাং যাওয়ার পথ খুলে আবার অক্টোবরের ১৫ তারিখের পর বন্ধ হয়ে যায় ।মে মাসের পুরোটাই ভালোই বরফের দেখা পাবেন । আপনারা অনেকে পুজোর সময়ও প্ল্যান করে থাকেন তারাও মোটামুটি ভালোই বরফের আশা করতে পারেন। রোটাং এর কাছেই মারি নামের স্পট আছে যেখানে আপনারা খাওয়া দাওয়া সেরে নিতে পারেন। এখানে বেশ কিছু রেস্তোরা রয়েছে যার দাম সাধ্যের মধ্যেই । রুটি ১০ টাকা প্রতি পিস, নিরামিষ থালি দেড়শ টাকা, এছাড়াও চিকেন ডিম সবই পাবেন । রোটাং থেকে ফেরার পথে দেখে নিলাম অটল টা্নেল । পিরপাঞ্জাল পর্বতমালার কোলে তিন নম্বর জাতীয় সড়কের ওপর এই টানেল বিশ্বের দীর্ঘতম হাইওয়ে টানেল ।১০ হাজার ফুট উচ্চতায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল চালু হয় ২০২০ সালে । মানালি থেকে লে - লাদাখ যাওয়ার জন্য এই টানেল ব্যবহার করা হয়। যদি হাতে সময় থাকে তাহলে এর সাথে আপনারা যোগিনী ফল্স ট্রেক করে যেতে পারেন । পৌঁছে যেতে পারেন ৪ হাজার বছরের পুরানো বশিষ্ঠ্য মন্দির ,যেখানে বিয়াশ কুন্ড থেকে বিপাশা নদীর উৎপত্তিস্থল আপনারা দেখতে পারবেন । মানালি ফিরে আসার পথেই আপনারা পাবেন শিশু এবং কোকসার নামের দুটি সুন্দর পর্বত উপত্যকা সেখানেও বেশ কিছুটা সময় আপনারা কাটিয়ে নিতেই পারেন। সব মিলিয়ে ৫ থেকে ৬ দিন হাতে রাখলে সিমলা এবং মানালি মোটামুটি ভালোভাবেই আপনাদের ঘোরা হয়ে যাবে । এবার ফেরার পালা ,মানালি থেকে চন্ডিগড় হয়ে আমরা হাওড়া ফিরব । মানালি- চন্ডিগড় এর দূরত্ব প্রায় ২৭০ কিলোমিটার, তাই সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা রওনা দিয়ে দিয়েছিলাম ।চন্ডিগড় থেকে অনেক রাতে আমাদের হাওড়া ফেরার ট্রেনটা ছিল তাই সেখানে আমরা রিটায়ারিং রুম বুক করে রেখেছিলাম । ৭০০ টাকার মতো পড়েছিল এসি রিটায়ারিং রুমের জন্য।
হাওড়া থেকে কালকা যাওয়ার ট্রেন : নেতাজি এক্সপ্রেস (১২৩১১ ) রাত ০৯:৫৫ তে ছাড়ে হাওড়া থেকে
কালকা থেকে সিমলা যাওয়ার টয় ট্রেন : ১. শিবালিক এক্সপ্রেস (৫২৪৫১) ০৫:৪৫ এ ছাড়ে , ২. কালকা – সিমলা এক্সপ্রেস (৫২৪৫৩ ) ০৬:২০ তে ছাড়ে, ৩.কালকা – সিমলা এক্সপ্রেস (৫২৪৫৯) ০৭:০০ তে ছাড়ে, ৪. হিমালয়ান কুইন (৫২৪৫৫) ১১.৫৫ এ ছাড়ে।
© anirban banzara Anirban Ghosh Aparupa Maity ( all rights reserved )