27/06/2026
রাশিয়া: কেন বাংলাদেশিদের কাছে এত জনপ্রিয়? সত্যিই কি এখন রাশিয়ায় যাওয়া উচিত?
বিশ্বের মানচিত্রে যদি এমন একটি দেশের নাম বলতে হয়, যা একই সঙ্গে শক্তি, রহস্য, ইতিহাস এবং সুযোগের প্রতীক—তাহলে নিঃসন্দেহে সেই দেশটি হলো রাশিয়া। আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই দেশটি ইউরোপ ও এশিয়া—দুই মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত। প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশ পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় ১১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। এত বড় যে, বাংলাদেশের মতো প্রায় ১১৬টি দেশ এর ভেতরে সহজেই জায়গা হয়ে যাবে।
২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী রাশিয়ার জনসংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি ৩০ লাখ। যদিও আয়তনে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ, তবুও জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক কম। বিশাল বনাঞ্চল, বরফে ঢাকা সাইবেরিয়া, অসংখ্য নদী, হ্রদ এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের বিশাল ভাণ্ডার রাশিয়াকে বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী দেশে পরিণত করেছে।
রাশিয়ার রাজধানী মস্কো, যা শুধু দেশের রাজনৈতিক কেন্দ্রই নয়, বরং ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক শহর। দেশটির সরকারি ভাষা রুশ (Russian) এবং মুদ্রার নাম রাশিয়ান রুবল (RUB)। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিময় হার ওঠানামা করলেও সাধারণভাবে ১ রাশিয়ান রুবল প্রায় ১.৪ থেকে ১.৬ বাংলাদেশি টাকার সমান। অর্থাৎ, যদি কারও মাসিক বেতন ১ লাখ রুবল হয়, তাহলে বাংলাদেশি টাকায় তা আনুমানিক ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সমান হতে পারে। তবে ডলারের মূল্য পরিবর্তনের সঙ্গে রুবলের মূল্যও পরিবর্তিত হয়, তাই এটি স্থায়ী নয়।
ধর্মীয় দিক থেকে রাশিয়া একটি বহুধর্মীয় রাষ্ট্র। মোট জনসংখ্যার বড় অংশ রাশিয়ান অর্থোডক্স খ্রিস্টান। এছাড়া প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাতার, চেচেন, বাশকিরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিমদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বৌদ্ধ, ইহুদি এবং অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও সেখানে বসবাস করেন। শুধু ধর্ম নয়, জাতিগত দিক থেকেও রাশিয়া অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। দেশটিতে ১৯০টিরও বেশি জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, যার মধ্যে রাশিয়ান, তাতার, বাশকির, ইয়াকুত, চেচেন, বুরিয়াতসহ আরও অনেক জনগোষ্ঠী রয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষ রাশিয়াকে কেন এত পছন্দ করে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইতিহাস, রাজনীতি এবং অর্থনীতি—তিনটিকেই একসঙ্গে দেখতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন আজও অনেক মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব রেখে গেছে। এছাড়া রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্র। আধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক অস্ত্র, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের দৃঢ় অবস্থান অনেক বাংলাদেশির আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাশিয়ার জীবনযাত্রা, চাকরি এবং উচ্চ বেতনের নানা ভিডিও দেখে অনেক তরুণ সেখানে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
প্রতি বছর শত শত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সরকারি বৃত্তি নিয়ে রাশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, পারমাণবিক বিজ্ঞান এবং মহাকাশ গবেষণায় রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক সুনাম রয়েছে। অনেক কোর্সে টিউশন ফিও তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে দেশটি জনপ্রিয়।
শুধু পড়াশোনা নয়, চাকরির সুযোগও অনেককে আকৃষ্ট করে। নির্মাণশিল্প, কারখানা, কৃষি, পরিবহন, আইটি এবং প্রকৌশল খাতে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। সাধারণ শ্রমিকদের মাসিক বেতন সাধারণত ৬০ হাজার থেকে ৯০ হাজার রুবল। দক্ষ কারিগরি কর্মীরা ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার রুবল পর্যন্ত আয় করতে পারেন। অন্যদিকে প্রকৌশলী, সফটওয়্যার ডেভেলপার, চিকিৎসক বা অভিজ্ঞ আইটি বিশেষজ্ঞদের বেতন দেড় লাখ থেকে ৩ লাখ রুবল বা তারও বেশি হতে পারে।
তবে শুধু বেতনের অঙ্ক দেখলেই হবে না। জীবনযাত্রার খরচও বিবেচনা করতে হবে। রাজধানী মস্কোতে বাসা ভাড়া, খাবার, যাতায়াত এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে একজন মানুষের মাসে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার রুবল পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। অন্যদিকে ছোট শহরগুলোতে ৪০ হাজার থেকে ৭০ হাজার রুবলের মধ্যেই জীবনযাপন সম্ভব। যদি কোম্পানি থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করা যায়।
রাশিয়ার আবহাওয়া বাংলাদেশের মানুষের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। শীতকালে অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা মাইনাস ২০ থেকে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। সাইবেরিয়ার কিছু এলাকায় এটি মাইনাস ৫০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। তাই সেখানে কাজ বা পড়াশোনা করতে গেলে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা জরুরি।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। অনেকেই জানতে চান, এখন রাশিয়ায় যাওয়া কি নিরাপদ? বাস্তবতা হলো, রাশিয়ার সব অঞ্চল যুদ্ধক্ষেত্র নয়। মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গসহ অধিকাংশ বড় শহরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চললেও সীমান্তবর্তী কিছু অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং লেনদেনের সীমাবদ্ধতা, কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক চাপও তৈরি হয়েছে। ফলে আগের তুলনায় বিদেশিদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
তাহলে কি এখন রাশিয়ায় যাওয়া উচিত? যদি আপনার কাছে বৈধ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি, সরকারি স্কলারশিপ অথবা নিশ্চিত চাকরির অফার থাকে, তাহলে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র দালালের কথায় বা অবাস্তব বেতনের লোভে যাওয়া কখনোই উচিত নয়। কারণ এতে প্রতারণা, অবৈধ অভিবাসন এবং আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।
সবশেষে বলা যায়, রাশিয়া এমন একটি দেশ যেখানে যেমন সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জও। উন্নত শিক্ষা, ভালো বেতন, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দেশটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে ভাষা, আবহাওয়া, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করলে রাশিয়া অনেকের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে।
#রাশিয়া #রাশিয়া_বেতন #রাশিয়া_ভিসা #রাশিয়া_যুদ্ধ #বিশ্ব_তথ্য