03/01/2026
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মধ্যবর্তিনী’ গল্পের কাহিনী সংক্ষেপ
ভূমিকা:
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'মধ্যবর্তিনী' একটি মনস্তাত্ত্বিক ছোটগল্প। নিঃসন্তান দাম্পত্য জীবনে স্বামীর সুখের কথা ভেবে স্ত্রী যখন নিজেই স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের ব্যবস্থা করেন, তখন সম্পর্কের সমীকরণ কীভাবে বদলে যায়—তাই এই গল্পের মূল উপজীব্য।
কাহিনী বিন্যাস:
১. সুখী দাম্পত্য ও অপূর্ণতা: গল্পের নায়ক নিবারণ এবং তার স্ত্রী হরসুন্দরী দীর্ঘকাল সুখে সংসার করেছেন। তাদের অগাধ ভালোবাসা ছিল, কিন্তু সংসারে কোনো সন্তান ছিল না। এই অভাববোধ হরসুন্দরীকেই বেশি পীড়িত করত।
২. হরসুন্দরীর আত্মত্যাগ ও দ্বিতীয় বিবাহ: নিবারণ তার প্রথম স্ত্রীতেই সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু হরসুন্দরী স্বামীর বংশরক্ষা এবং বার্ধক্যের একাকিত্ব ঘোচানোর কথা ভেবে জেদ ধরে নিবারণকে পুনরায় বিয়ে করান। নিবারণ অনিচ্ছুক হলেও শেষ পর্যন্ত শৈলবালা নামক এক রূপবতী কিশোরীকে বিয়ে করতে রাজি হন।
৩. মানসিক পটপরিবর্তন: বিয়ের পর দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায়। হরসুন্দরী ভেবেছিলেন শৈলবালা ছোট বোনের মতো হবে এবং তিনি নিজে বড় দিদির মতো সংসার সামলাবেন। কিন্তু যুবতী শৈলবালার চপলতা ও রূপে নিবারণ এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে, তিনি হরসুন্দরীকে অবহেলা করতে শুরু করেন। নিবারণের কাছে হরসুন্দরী হয়ে ওঠেন 'প্রয়োজনীয়' আর শৈলবালা হয়ে ওঠেন 'আকাঙ্ক্ষিত'।
৪. ত্রিকোণ দ্বন্দ্ব ও মধ্যবর্তিনী: হরসুন্দরী বুঝতে পারেন যে তার স্বামী তার থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে গেছেন। অন্যদিকে, শৈলবালা নিবারণের মনোযোগ সম্পূর্ণ নিজের দিকে টেনে নেন। হরসুন্দরী যখন অবহেলার যন্ত্রণায় পিত্রালয়ে চলে যান, তখন নিবারণ তাকে ফেরানোর কোনো চেষ্টা করেননি। হরসুন্দরী ও নিবারণের দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্কের মাঝে শৈলবালা এক দুর্ভেদ্য দেয়াল বা 'মধ্যবর্তিনী' হিসেবে দাঁড়িয়ে যান।
৫. পরিণতি: গল্পের শেষে দেখা যায়, শৈলবালার অসুস্থতা এবং অস্থিরতায় নিবারণের জীবন বিষাদময় হয়ে ওঠে। যে ভালোবাসার টানে নিবারণ হরসুন্দরীকে ভুলেছিলেন, সেই প্রেমই তাকে ক্লান্ত করে ফেলে। অবশেষে শৈলবালার মৃত্যু এবং হরসুন্দরীর ফিরে আসার মধ্য দিয়ে এক বিষাদময় রিক্ততা ফুটে ওঠে।
উপসংহার:
রবীন্দ্রনাথ এই গল্পে দেখিয়েছেন যে, হৃদয়ের অধিকারে ভাগাভাগি চলে না। হরসুন্দরীর অতিরিক্ত আত্মত্যাগ এবং শৈলবালার আগমনে নিবারণের চারিত্রিক স্খলন—এই তিনের সংঘাতেই গল্পটি ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে।