19/05/2026
যিলহজ্ব ও যিলহজ্বের প্রথম দশক : ফযীলত
হিজরী সনের সর্বশেষ মাস যিলহজ্ব- হজ্ব ও কুরবানীর মাস। ইসলামী শরীয়তে অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ মাস এটি। কুরআনে কারীমের সূরা তাওবার ৩৬ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে চার মাসকে সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন মাহে যিলহজ্ব তার অন্যতম। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إِنّ الزّمَانَ قَدِ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللهُ السّمَوَاتِ وَالأَرْضَ، السّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلاَثٌ مُتَوَالِيَاتٌ: ذُو القَعْدَةِ، وَذُو الحِجّةِ، وَالمُحَرّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ الّذِي بَيْنَ جُمَادَى، وَشَعْبَانَ.
সময়ের হিসাব যথাস্থানে ফিরে এসেছে, আসমান-যমীনের সৃষ্টির সময় যেমন ছিল। (কারণ, জাহেলী যুগে আরবরা নিজেদের স্বার্থ ও মর্জিমত মাস-বছরের হিসাব কমবেশি ও আগপিছ করে রেখেছিল।) বার মাসে এক বছর। এর মধ্য থেকে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি মাস ধারাবাহিক- যিলকদ, যিলহজ্ব ও মুহাররম। আরেকটি হল রজব, যা জুমাদাল আখিরাহ ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৬৬২
হজ্ব ও কুরবানী ইসলামের স্বতন্ত্র দুটি মৌলিক ইবাদত। ইবাদতদুটি ‘মিন শাআইরিল্লাহ’ তথা ইসলামের পরিচয়-চিহ্ন বহনকারী দুটি প্রতীক। ইবাদতদুটি সংঘটিত হয় এ মাসে। আর হজে¦র দিকে সম্বন্ধিত করেই তো এ মাসের নামকরণ হয়েছে যুলহিজ্জাহ-হজ্বের মাস! যেহেতু হজ্ব ও কুরবানী স্বতন্ত্র দুটি ইবাদত তাই এর জন্য রয়েছে স্বতন্ত্র ফযীলত, স্বতন্ত্র বিধান। আলাদা গুরুত্ব ও পৃথক মর্যাদা। যা ভিন্নভাবে আলোচনার দাবি রাখে।
এ মাসের ফযীলতপূর্ণ দিবসগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আশারায়ে যিলহজ্ব’ তথা যিলহজ্বের প্রথম দশক। কুরআন মাজীদের সূরা ফাজরে আল্লাহ তাআলা যে দশ রজনীর শপথ করেছেন, সেই ‘দশ’ হল যিলহজ্বের এই প্রথম দশক। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., হযরত ইবনে যুবাইর রা. ও মুজাহিদ রাহ.-সহ পূর্ববর্তী-পরবর্তী অনেক মুফাসসির এ মতই ব্যক্ত করেছেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা ফাজর-এর তাফসীর দ্রষ্টব্য)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দশকের ব্যাপারে ইরশাদ করেন-
مَا مِنْ أَيّامٍ الْعَمَلُ الصّالِحُ فِيهَا أَحَبّ إِلَى اللهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيّامِ يَعْنِي أَيّامَ الْعَشْرِ.
আল্লাহর নিকট যিলহজ্বের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৩৮; সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৬৯; জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৫৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭২৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৯৬৮
বিশেষ করে এ দশদিনের মাঝে রয়েছে ইয়াওমে আরাফা। অর্থাৎ যিলহজ্ব মাসের নবম তারিখ। এই দিনে হাজ্বী ছাহেবান আরাফার ময়দানে উকূফ (অবস্থান) করেন। পবিত্র হজ্ব পালনের একটি ফরয বিধান হচ্ছে এই দিনে ‘উকূফে আরাফা’ তথা আরাফায় অবস্থান করা। হজ্বের মূল দিন হচ্ছে যিলহজ্বের নয় তারিখ ‘ইয়াওমে আরাফা’। এ দিনে বান্দার দিকে রবের রহমতের জোয়ার প্রবলবেগে ধাবিত হয়। অসংখ্য বান্দাকে তিনি এ দিনে ক্ষমা করে দেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النّارِ، مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ.
আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩৪৮
তাছাড়া এ মাসের যে দিনটি বিশেষ তাৎপর্য ধারণ করে তা হচ্ছে যিলহজ্বের দশম তারিখ। হাদীসের ভাষায় ‘ইয়াওমুন নাহর’। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনের ব্যাপারে বলেন-
إِنّ أَعْظَمَ الْأَيّامِ عِنْدَ اللهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَوْمُ النّحْرِ.
আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার নিকট সবচে মহিমান্বিত দিন হচ্ছে ‘ইয়াওমুন নাহর’ তথা কুরবানীর দিন। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৭৬৫
আল্লাহ তাআলা এ দিনটিকে মুসলমানের জন্য ঈদ সাব্যস্ত করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
أُمِرْتُ بِيَوْمِ الْأَضْحَى، جَعَلَهُ اللهُ عِيدًا لِهَذِهِ الْأُمّةِ.
আমাকে ‘ইয়াওমুল আযহা’র আদেশ করা হয়েছে (অর্থাৎ এ দিনে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে); এ দিবসকে আল্লাহ তাআলা এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৬৫৭৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৯১৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৪৩৬৫
অতএব আশারায়ে যিলহজ্ব, হজ্ব, কুরবানী, ইয়াওমে আরাফা, আইয়ামে তাশরীক প্রভৃতি সমূহ কল্যাণে বেষ্টিত একটি মাস যিলহজ্ব মাস। কাজেই এ মাসের খায়ের ও বরকত হাছিল করার ব্যাপারে মুমিন সজাগ-সতর্ক থাকে। আমলে আমলে, নেকী ও কল্যাণের মাধ্যমে এ মাসের বরকতময় দিনগুলোকে প্রাণবন্ত রাখার মাঝেই সে সফলতা খুঁজে পায়।