21/09/2026
পরিবহন দপ্তরের বিগত এক বছরের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম (১৮/০৯/২০২৫ - ২০/০৯/২০২৬)
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পরিচালক (পরিবহন) হিসেবে দ্বিতীয় বছরের দায়িত্ব শেষ করলাম। পরিবহন দপ্তরে ড্রাইভারের সংকট ও নতুন গাড়ি ক্রয়ে সরকারী নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নতুন নিয়োগকৃত শিক্ষক-কর্মকর্তা ও নতুন চালু হওয়া দুইটি হলের শিক্ষার্থীসহ সকলের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করার জন্য পরিবহন দপ্তর আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। পরিবহন সেবার মান বৃদ্ধি, গুণগত পরিবর্তন ও শৃঙ্খলার মধ্যে আনার চেষ্টা করেছি।
ব্যর্থতাসমূহঃ
১। কিছু সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পরেও সমাধানে ব্যর্থ হয়েছি। বিশেষ করে, দীর্ঘদিন সরকার বিআরটিসি’র জন্য পর্যাপ্ত নতুন গাড়ি ক্রয় করছে না এবং বিআরটিসি’র গাড়িতে হেল্পার দেওয়ার সুযোগ নাই। ফলে যবিপ্রবি পরিবহন দপ্তরের আওতাবহির্ভুত গাড়িগুলোর গুণগত মানোন্নয়নে বিআরটিসি’র বিভাগীয় খুলনা অফিস ও ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে সশরীরে ও পত্র মারফত একাধিকবার যোগাযোগ করেও প্রত্যাশিত সমাধান পাইনি।
২। চলন্ত গাড়ি থেকে নামতে যেয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন গত এক বছরে। ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। দূর্ঘটনাগুলোর জন্য পরিবহন দপ্তর দুঃখ প্রকাশ করছে।
সফলতাসমূহঃ
কিছু ব্যর্থতার মধ্যেও বিগত দুই বছরে (আনুমানিক ১২ জন ড্রাইভার সংকট নিয়ে) সকলের সহযোগিতায় পরিবহন দপ্তরে কিছু উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। সকলের সদয় অবগতি ও মূল্যবান মতামতের জন্য উল্লেখযোগ্য সেবাসমূহ নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ
১। বিগত বছরের পরিবহন সেবার অন্যতম সাফল্য হিসেবে প্রথমে উল্লেখ করতে চাই- বীরপ্রতীক তারামন বিবি হলে ফুড পয়জনিং (খাদ্যে বিষক্রিয়া) এর মারাত্মক পরিস্থিতিতে আক্রান্ত শতাধিক রোগীকে তড়িৎ গতিতে যথাসময়ে হাসপাতালে পৌছানো ও শতভাগ শিক্ষার্থী সুস্থ্য হয়ে নিরাপদে ক্যাম্পাসে ফেরত নিয়ে আসার ব্যবস্থা গ্রহণ। ঐ এক সপ্তাহে ড্রাইভার ও হেল্পারদের ২৪ ঘন্টার নিরলস পরিশ্রমের জন্য ড্রাইভার, হেল্পার ও দপ্তরের সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। এসময় রোগীদের সাহায্যার্থে শতাধিক স্বেচ্ছাসেবীকে ক্যাম্পাস টু হাসপাতাল টু ক্যাম্পাস নিরবিচ্ছিন্ন পরিবহন সেবা নিশ্চিত করা হয়।
২। সকল ড্রাইভার ও হেল্পারগণের মানসিকতা পরিবর্তন ও পরিবহন দপ্তরের কঠোর নজরদারিতে জ্বালানি ও ইন্জিন অয়েল (মবিল) ব্যবহারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হয়েছে। প্রতিটি গাড়ির মাইলেজ (প্রতি লিটার জ্বালানিতে অতিক্রান্ত দুরত্ব) উল্লেখযোগ্য পরিমাণে (১৫-৬০%, গড় আনুমানিক ৩০%) বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে আনুমানিক চল্লিশ লক্ষাধিক টাকার জ্বালানি ও বিগত বছরগুলোর তুলনায় লক্ষাধিক টাকার ইন্জিন অয়েল সাশ্রয় হয়েছে। গাড়ির সংখ্যা, রুট সংখ্যা ও ট্রিপ সংখ্যা বৃদ্ধির পরেও বিগত বছরগুলোর তুলনায় জ্বালানি ও বিআরটিসি ভাড়া খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হয়েছে।
৩। শিক্ষক-কর্মকর্তার সংখ্যা বৃদ্ধি (আনুমানিক ৫০ জন) ও আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির (আনুমানিক ২০০০ জন) পরেও একই পরিমাণ গাড়ি (২৯ টি) ও ২৩ জন ড্রাইভার দিয়ে (ড্রাইভার ও হেলপারদের ক্যাজুয়াল লিভ ও শ্রান্তি বিনোদন ছুটি প্রদান করে) নিয়মিত পরিবহন সেবা ও রিকুইজিশন সচল রাখা সম্ভব হয়েছে।
৪। সকল ড্রাইভার ও হেল্পারগণের সচেতনতা ও দায়িত্বের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে বিগত দুই বছরে যবিপ্রবি পরিবহন দপ্তরের গাড়িগুলো বড় কোন দুর্ঘটনার শিকার হয়নি।
৫। শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধের দিনে (অফিস খোলা) দৈনন্দিন প্রয়োজনে বিকাল ৪ঃ০৫ ঘটিকায় ক্যাম্পাস টু শহর এবং রাত ৭ঃ৩০ ও ৮ঃ৩০ ঘটিকায় শহর টু ক্যাম্পাস পরিবহন সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।
৬। কর্মদিবসে ক্যাম্পাস থেকে শহরে যাওয়ার জন্য সন্ধ্যা ৬ঃ১০ এ লাইব্রেরি ট্রিপে গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। রাত ৭ঃ১০ ও ৮ঃ১০ ঘটিকার ট্রিপে শিক্ষার্থীরা শহরে যেতে পারছেন।
৭। বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের মার্কেট ট্রিপে গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দুইটি ভিন্ন সময়ে (বিকাল ৩ঃ৩০ ও ৫ঃ০০ ঘটিকায়) শহরে যেতে পারা ও দুইটি ভিন্ন সময়ে (রাত ৭ঃ০০ ও ৯ঃ০০ ঘটিকায়) ক্যাম্পাসে ফেরত আসতে পারার সুযোগ করা হয়েছে।
৮। কর্মদিবসে (শনিবার থেকে বুধবার) শিক্ষার্থীদের জন্য চারটি ভিন্ন সময়ে (সন্ধ্যা ৬ঃ৩০, রাত ৭ঃ৩০, ৮ঃ২০ ও ৯ঃ০০ ঘটিকায়) শহর থেকে ক্যাম্পাসে ফেরত আসার সুযোগ করা হয়েছে।
৯। যবিপ্রবি ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ঝিনাইদহ শহর টু ভেটেরিনারি ক্যাম্পাসে পরিবহন সেবা নতুনভাবে চালু করা হয়েছে।
১০। শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য প্রতিদিন সন্ধা ৬ঃ০০ ঘটিকায় (শিক্ষক-কর্মকর্তা উপস্থিত থাকা সাপেক্ষে) গোধূলি ট্রিপ নতুনভাবে চালু করা হয়েছে এবং রাত ৮ঃ০০ ঘটিকায় রিসার্চ ট্রিপ চালু রয়েছে।
১১। শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের শহর থেকে ক্যাম্পাসে আসার জন্য মার্কেট ট্রিপ সুবিধা বর্ধিত করা হয়েছে। বর্তমানে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে (সন্ধ্যা ৬ঃ৩০, রাত ৭ঃ৩০ ও রাত ৮ঃ৪৫) মার্কেট ট্রিপ চালু রয়েছে।
১২। ডিন-চেয়ারম্যান-প্রভোস্ট-প্রক্টর-পরিচালক মহোদয়দের জন্য একটি মাইক্রোবাস নতুনভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মার্কেটট্রিপে আসন সংকুলান না হওয়ায় শুক্রবার বিকালে নতুনভাবে একটি মার্কেটট্রিপ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
১৩। পরিবহন সংক্রান্ত তথ্য জানতে, পরামর্শ ও অভিযোগ জানাতে হটলাইন (ফোন নম্বর, ম্যাসেন্জার) সেবা চালু করা হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগ ও পরামর্শ আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
১৪। পরিবহন সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য উপকারভোগীদের মাঝে সহজে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ফেসবুকে “পরিবহন দপ্তর, যবিপ্রবি” পেজ চালু করা ও পরিবহন সংক্রান্ত সকল তথ্য ঐ পেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ও ইমেইলে (শিক্ষক-কর্মকর্তাদের) নিয়মিত আপডেট করা হচ্ছে।
১৫। যবিপ্রবির সকল গাড়িতে ভেহিকেল ট্রাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) চালু করে গাড়িগুলোর অবস্থান জানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভিটিএস সেবা নিরবিচ্ছিন্ন রাখার জন্য ও উৎকর্ষ সাধনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনজন শিক্ষককে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
১৬। যবিপ্রবির সকল পরিবহনের মালিকানার ধরন পরিবর্তন করে ট্যাক্স বাবদ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ সাশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
১৭। প্রকৌশল দপ্তরের সহযোগিতায় গ্যারেজ এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং মনিটরিং এর ব্যবস্থাকরণের মাধ্যমে সকল গাড়ির নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট লোকদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
১৮। ড্রাইভার ও হেল্পারদের অধিকালের (অভারটাইম) কর্মঘণ্টার লিমিট বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে, ড্রাইভার ও হেল্পারগণ অধিক পরিশ্রমের বিনিময়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
১৯। এছাড়াও গত ঈদুল আযহায় ক্যাম্পাস টু যশোর রেল স্টেশন পরিবহন সেবা, ১ম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষা ও ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে@ পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা, রমজান মাসে প্রতিদিন ইফতারের পরে ক্যাম্পাস থেকে শহর ও শহর থেকে ক্যাম্পাসে পরিবহন সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।
ভবিষ্যত পরিকল্পনাসমূহঃ
নিম্নে উল্লেখিত ভবিষ্যত পরিকল্পনার প্রায় সকল বিষয় নতুন গাড়ি ক্রয় ও ড্রাইভার নিয়োগের উপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত সংখ্যক গাড়ি ও ড্রাইভার পরিবহন দপ্তরে যুক্ত হলে সেবাগুলো ভবিষ্যতে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
১। শিক্ষার্থীদের কিছু দাবি যেমন নতুন রুট চালু করা, কিছু রুট বর্ধিত করা, কর্মদিবসে পরিপূর্ণ শাটল (প্রতি ঘন্টায় গাড়ির ব্যবস্থা, বর্তমানে আংশিক চলমান) পরিবহন সেবা, শুক্রবারে ও বন্ধের দিনে মার্কেটট্রিপ চালু করা।
২। শিক্ষার্থীদের ইন্ডাস্ট্রি ভিজিটে পরিবহন সেবা প্রদান, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য ব্যক্তিগত রিকুইজিশন চালু করা, শিক্ষার্থীদের মার্কেটট্রিপ আরো আরামদায়ক করার সুযোগ রয়েছে।
৩। সার্বক্ষনিক দুইটি এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসে রাখা ও ভেটেরিনারি ক্যাম্পাসে এ্যাম্বুলেন্স সেবা প্রদান করা।
৪। শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বাসে সিটের সংকট রয়েছে। বিশেষ করে, শিক্ষকদের বাসে প্রায়ই সিট সংকট হচ্ছে এবং সর্বদাই বেবি সিটে বসে যাতায়াত করতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে সমস্যাটি সমাধান করা দরকার।
৫। গাড়িগুলো রাখার জন্য পার্কিংয়ের পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া ও পার্কিং শেড তৈরি করা।
পরিবহনের সার্বিক পরিবর্তনে পরিবহন দপ্তরের সকলের প্রতি, পরিবহন পরিচালনা কমিটির সকল সদস্যের প্রতি, সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানদের প্রতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়, উপ-উপাচার্য মহোদয় ও কোষাধ্যক্ষ মহোদয়ের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। সেই সাথে বিভিন্ন সময়ে যারা সুচিন্তিত মতামত প্রদান করেছেন তাদেরকে সাধুবাদ জানাই। সকলের সহযোগিতায় পরিবহন দপ্তর ভবিষ্যতে আরো যাত্রীবান্ধব ও সেবামূলক দপ্তরে পরিণত হবে এই কামনা করি।