02/06/2026
One Kidney village
কাজল আরেফিন অমির কিডনি নাটকের বাস্তব প্রতিফলন।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বৈগুনি গ্রাম। নামটি সাধারণ হলেও স্থানীয়দের কাছে গ্রামটি এখন ভয়াবহ এক পরিচয়ে পরিচিত- ‘এক কিডনির গ্রাম’। কারণ, এই গ্রামের অনেক মানুষ দারিদ্র্য, ঋণ, প্রতারণা কিংবা প্রলোভনের শিকার হয়ে নিজের একটি কিডনি বিক্রি করেছেন।
শুধু বৈগুনি নয়, কালাই উপজেলার বিনাইসহ আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রামও কিডনি পাচারকারী দালালচক্রের নজরে রয়েছে।
এই এলাকার মানুষের বড় একটি অংশ আর্থিক সংকটে জর্জরিত। সেই অসহায়ত্বকেই পুঁজি করে দালালরা তাদের দ্রুত টাকা পাওয়ার স্বপ্ন দেখায়।
কেউ ঋণ শোধ করতে, কেউ সংসার চালাতে, কেউ বা ঘর বানানোর আশায় কিডনি বিক্রিতে রাজি হয়েছেন। আবার কেউ চাকরির প্রলোভনে ভারতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
অভিযোগ আছে, কাজ দেওয়ার কথা বলে অনেককে সীমান্তের ওপারে নিয়ে গিয়ে জোর করে কিডনি নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগকেই মেডিকেল ভিসায় ভারতে নেওয়া হয়। দালালরা তাদের যাতায়াত, কাগজপত্র ও হাসপাতালের ব্যবস্থা করে। সেখানে গিয়ে অনেকের পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর ভুয়া পরিচয়পত্র, নোটারি সনদ ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে কিডনিদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে মিথ্যা আত্মীয়তার সম্পর্ক দেখানো হয়। কারণ, ভারতের আইনে সাধারণত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে বা সরকারি অনুমোদনের মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ আছে। দালালচক্র সেই আইনকেই জালিয়াতির মাধ্যমে ফাঁকি দেয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে একটি কিডনির দাম ২২ থেকে ২৬ হাজার ডলার পর্যন্ত হলেও দরিদ্র দাতারা পান মাত্র তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা। বাকি অর্থ ভাগ হয় দালাল, জাল কাগজপত্র তৈরি করা ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট চক্রের মধ্যে।
অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত টাকাও পুরোপুরি পান না ভুক্তভোগীরা। কিডনি দেওয়ার পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ বা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাও থাকে না। ফলে অনেকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা, দুর্বলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ক্লান্তি ও শারীরিক জটিলতায় ভোগেন।
একটি কিডনি নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, তবে চিকিৎসকের নিয়মিত তত্ত্বাবধান জরুরি। কিন্তু কালাইয়ের দরিদ্র কিডনিদাতাদের অনেকেরই সেই সামর্থ্য নেই। ফলে সামান্য টাকার আশায় নেওয়া সিদ্ধান্ত পরে তাদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ ডেকে আনে।
কেউ কাজ করতে পারেন না, কেউ সংসার চালাতে ব্যর্থ হন, কেউ আবার প্রতারণার ক্ষত নিয়ে জীবন কাটান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পাচার বন্ধে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। দরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, সীমান্তপারের তথ্য আদান-প্রদান এবং কিডনি প্রতিস্থাপন ব্যবস্থার কঠোর নজরদারি।