07/08/2025
ট্রাভেল এজেন্সি গ্রাহকের টাকা নিয়ে পালানোর ঘটনা নতুন কিছু নয়, এমন অনেক ঘটনা আগেও ঘটেছে—বর্তমানেও ঘটতেছে। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা দেওয়া হলো, যা বিভিন্ন বাংলাদেশী সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে—
১. ট্রাভেল মেট্রো (Travel Metro)
—ঘটনা: ২০২৩ সালে এই এজেন্সি হজ ও উমরাহ প্যাকেজের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
—ক্ষতির পরিমাণ: প্রায় ৫ কোটি টাকা। সূত্র: প্রথম আলো, সমকাল
২. সোনার বাংলা ট্যুরস (Sonar Bangla Tours)
—ঘটনা: ২০২২ সালে এজেন্সিটি বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করে পালিয়ে যায়।
—ক্ষতিগ্রস্ত: ২০০+ মানুষ। সূত্র: যায়যায়দিন, দৈনিক ইত্তেফাক
৩. গ্রিনলাইন ট্রাভেলস (Greenline Travels)
—ঘটনা: ২০২১ সালে এই এজেন্সি বিভিন্ন ট্যুর প্যাকেজের জন্য অগ্রিম টাকা নিয়ে দপ্তর বন্ধ করে দেয়।
—ক্ষতিগ্রস্ত: ১০০+ পরিবার। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
৪. রয়েল বেঙ্গল ট্যুরস (Royal Bengal Tours)
—ঘটনা: ২০২০ সালে এজেন্সিটি অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার ভিসা প্রসেসিংয়ের নাম করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। সূত্র: নয়া দিগন্ত
৫. হাল্ট্রিপ (Haltrip) – টিকেটের টাকা নিয়ে পালিয়েছে
—২০২৩ সালে হাল্ট্রিপ নামের একটি অনলাইন ট্রাভেল প্ল্যাটফর্ম আন্তর্জাতিক ফ্লাইট টিকেট বুকিংয়ের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে টিকেট না দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
—ক্ষতিগ্রস্ত: ১০০+ গ্রাহক (প্রতিটি অর্ডারে ৫০,০০০ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত)। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন (২০২৩), সমকাল।
৭. ট্যুর ডেস্টিনি (Tour Destiny)
—অভিযোগ: ২০২১ সালে হজ প্যাকেজের টাকা নিয়ে দপ্তর বন্ধ করে দেয়। সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক।
৮. গ্লোবাল ট্রাভেলস (Global Travels)
—অভিযোগ: বিদেশে কাজের ভিসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা (২০২০)। সূত্র: কালের কণ্ঠ।
৯. উইনার ইন্টারনেশনাল (Winner International) – বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা
—ঘটনা: এই এজেন্সি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে চাকরি দেওয়ার নাম করে হাজারো মানুষ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করে (২০২১-২০২২)। ভুয়া ভিসা ও এমপ্লয়মেন্ট লেটার দেওয়া হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গ্রাহকরা কিছুই পাননি।
—ক্ষতিগ্রস্ত: ২০০+ জন, আনুমানিক ক্ষতি ১০ কোটি টাকা+। সূত্র: প্রথম আলো, যায়যায়দিন।
১০. স্টারলাইন ট্রাভেলস (Starline Travels)
—অভিযোগ: হজ ও উমরাহ প্যাকেজের টাকা নিয়ে প্রতারণা (২০২২)।
১১. গোল্ডেন ট্যুরস (Golden Tours)
—অভিযোগ: মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর ভিসার নামে টাকা নিয়ে দেউলিয়া (২০২১)।
১২. ড্রিম হোলিডেজ (Dream Holiday)
—অভিযোগ: হানিমুন প্যাকেজের টাকা নিয়ে গ্রাহকদের ঠকানো (২০২০-২০২১)।
১৩. ২৪ টিকেট ডটকম
—এজেন্সিটি অনলাইনে আকর্ষণীয় অফার দিয়ে ফ্লাইট টিকেট, হজ ও উমরাহ প্যাকেজ এবং ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করে। সূত্র: ইত্তেফাক
১৪. বিএসবি কন্সালটেন্সি
—ক্ষতিগ্রস্ত: ৫০+ গ্রাহক, ক্ষতি ২-৩ কোটি টাকা। সূত্র:সমকাল, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
১৫. ফাইট এক্সপার্ট (Flight Expert) – ভুয়া টিকেট ও প্রতারণা
—ঘটনা: ২০২২-২০২৩ সালে ফাইট এক্সপার্ট নামের একটি এজেন্সি গ্রাহকদেরকে "ডিসকাউন্টেড" ফ্লাইট টিকেটের অফার দিয়ে টাকা আদায় করলেও টিকেট ইস্যু করেনি।
—ক্ষতিগ্রস্ত: আনুমানিক ৩-৫ কোটি টাকা (২০০+ গ্রাহক)। সূত্র: প্রথম আলো (২০২৩), সূত্র: যায়যায়দিন।
ফাইট এক্সপার্ট থেকে হাল্ট্রিপ – কীভাবে প্রতিবছর হাজারো গ্রাহক ঠকছেন টিকেট-ভিসার লোভে। "৫০% ডিসকাউন্টে শুধু আজ!" – ফেসবুকের এমন একটি বিজ্ঞাপন দেখে ঢাকার চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম (ছদ্মনাম) ২০২৩ সালে ফাইট এক্সপার্ট এজেন্সিতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জমা দেন কানাডা ট্যুরের জন্য। তিন মাস পর বুঝতে পারেন, এজেন্সির ফোন বন্ধ, অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ডাউন। রফিকুলের মতো হাজারো মানুষ প্রতিবছর ট্রাভেল এজেন্সির নামে কোটি কোটি টাকা হারাচ্ছেন। প্রশ্ন হলো, এই সংঘবৃত প্রতারণা বন্ধে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কোথায়?
কীভাবে চলছে এই প্রতারণা?
১. ভুয়া অফারের জাল:
—স্ক্যামাররা ফেসবুক/ইনস্টাগ্রামে "বিশেষ ডিসকাউন্ট" দিয়ে গ্রাহকদের আকর্ষণ করে। যেমন: "৭ দিনের থাইল্যান্ড ট্যুর মাত্র ৩০ হাজার টাকা!"
—মনস্তাত্ত্বিক কৌশল: "অফার আজই শেষ!" বলে তাড়াহুড়ো সৃষ্টি করা হয়।
২. জালিয়াতির নতুন পদ্ধতি:
—ফাইট এক্সপার্টের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ভুয়া টিকেট কনফার্মেশন (PNR) দেওয়া হতো, যা এয়ারলাইন্সের সিস্টেমে থাকত না।
—কিছু এজেন্সি "ট্যুরিজম বোর্ড রেজিস্টার্ড" দাবি করে ফেক সনদ দেখায়।
৩. টাকা আত্মসাতের পর:
—টাকা পেয়ে এজেন্সি অফিস বন্ধ করে দেয়।
—নতুন নামে আবার ব্যবসা শুরু করে। যেমন: ফাইট এক্সপার্ট → ফ্লাইট এক্সপার্ট-25
সময় এখনই পদক্ষেপের:
"গ্রাহক সুরক্ষা আইন ২০২৫" থাকলেও ট্রাভেল স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে তা প্রায় অকার্যকর। প্রয়োজন:
১. ট্যুরিজম ও আতাব বোর্ডের সক্রিয় মনিটরিং ও ব্ল্যাকলিস্ট প্রকাশ।
২. ট্যুরিজম মন্ত্রণালয়, বিমান ও সিভিল এসোসিয়েশন ও অধীনস্ত সকল ইউনিটের মনিটরিং বৃদ্ধি করা।
৩. গ্রাহকদের যতটা সম্ভব ক্যাশ লেনদেন সীমিত করা।
৪. গ্রাহকদের অত্যাধিক ডিসকাউন্ট লোভ এড়িয়ে চলা।
—মন্তব্য: "একটি এজেন্সি বন্ধ হলে তিনটি নতুন নামে জন্ম নেয় – এই চক্র থামাতে সামষ্টিক সচেতনতা জরুরি," বলেছেন ভোক্তা অধিকার কর্মী ড. নাজমুল হক।
Collected