30/04/2026
সকাল সকাল একটা তিক্ততা নিয়ে হাজির হচ্ছি।
ছবিতে যে মগ দুইটা দেখছেন, দুইটাই আমার ঘরের মানুষের চা খাওয়ার মগ; আমারটা আলাদা। যাই হোক, কথা সেটা না।
এখানে একটা মগে তিনি সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে কফি খেয়েছেন, আরেকটি সকালে। এবং একটা মগও তিনি ত্রিশ সেকেন্ড ব্যয় করে রান্নাঘরে নিয়ে রাখতে পারেননি।
এই চিত্র গত ছয় বছরের। গত ছয় বছরেও আমার শত চেষ্টা, শত অনুরোধ, শত অভিযোগ, শত চিল্লাচিল্লি উনাকে একচুলও পরিবর্তন করতে পারেনি।
এটা সামান্য, আরো আছে।
খাবার খাবে বিছানায় বসে। এক পায়ের উপর ফোন, লাইড ভলিউমে পাকিস্তানি সিরিয়াল, আরেক পায়ের উপর ভাতের প্লেট। নজর ফোনের দিকে। টুপটুপ করে বিছানায় ভাত পড়ছে।
যে কোনো খাবারের প্যাকেট খুলে সে প্যাকেট বিছানার উপর, সাইড টেবিলের উপর, খাটের ফাঁকে ফেলে রাখে। অথচ আমার বাসায় আমি চারটা বিন রেখেছি। এই প্যাকেট হয়ত আমি সরাই, নয়ত চিৎকার করে উনাকে দিয়ে সরাই। দুইটার একটাও না করলে এই প্যাকেট একটা দুটো তিনটা করে খাটের চারপাশে জমে স্তুপ হবে। উনি হাঁটবেন, পায়ে এইসব পলি লাগবে তাও সরাবেন না। কারণ অভ্যাস নেই। কারণ উনার হাতে ফোন। হয়ত সিরিয়াল চলছে নয়ত গেম।
আমি গত ছয় বছরেও উনাকে পারিনি টেবিলে বসে খাওয়াতে। এমনকি অরোরা সলিড ধরার পরও একসাথে বসে একটা ফ্যামিলি ডিনারও না। বাচ্চাকে খাওয়া শেখাতে ফ্যামিলির একসাথে বসে খাওয়ার গুরত্ব নিয়ে হাজার ভিডিয়ো, হাজার পডকাস্ট উনাকে আমি শেয়ার করছি, লাভ হয়নি। উনি জানেও না অরোরা খেয়েছে নাকি খায়নি। কারণ, উনার সময় নেই। হাতের গেমে চাল চলতে হবে। একদিন উঁকি দিয়ে দেখেছি কী খেলে এসব। দেখি, ঘর বানায়, চাষাবাদ করে। আমি জানি না, যারা গেম খেলেন তারা হয়ত জানবেন, এগুলোর কি এমন নিয়ম আছে একবেলা না খেললে ফসল শুকিয়ে যায়? নয়ত এমন নিয়ম মেনে খেলবে কেন!
উনি ওদিকে গেমে ফসল ফলাচ্ছে আর এদিকে উনার ঘর ভেঙে যাচ্ছে, সে খবর উনাকে কে জানাবে!
যা বলছিলাম... এইযে উনার এসব অভ্যাস, কীভাবে হল? উত্তর- পরিবার। ছোট থেকে শেখায়নি। ইনি বড় হয়েও শেখেননি। পরিবার শিখিয়েছে উনি পুরুষ, পুরুষের কাজ আলাদা, উনি তাই শিখেছেন। আমি বাসার কাজে হেল্প চাইলে আমাকে এ কথাই শোনান, এসব উনার কাজ না, উনার কাজ বাইরে।
আমি কীভাবে বুঝলাম উনার পরিবার শেখায়নি। আমার ননদকে দেখে। উনার দুই ছেলে। একই প্যাটার্ণ। ওদের রুমে গেলে আমার দমবন্ধ হয়ে আসত। উনি বলতেন, ওরা তো ছেলে, এসব বুঝে না
মেয়ে হলে বুঝত।
সিরিয়াসলি?
পুরুষমানুষ তো আমার পরিবারেও আছে। আমার বাবার সত্তর চলছে। এখনও রান্নাবান্না করে, ঘর পরিষ্কার করে, নিজের কাপড় নিজেই ধোয়, বুয়াকে দেয় না, পছন্দ হয় না বলে।
আমার ভাই একজন শিক্ষা ক্যাডার। কলেজে যাওয়ার আগে, এসে ঘরের সব কাজ গুছিয়ে যায়। ঘরের এমন কোনো কাজ নেই যা ও জানে না। এত কিছু সামলেও দুই বাচ্চাকে সময় দেয়। বউকে ঘুমানোর, রেস্ট করার সময় দেয়। মায়ের ক্যান্সার, সবরকম সেবা করে। কেমোর পর মা বাথরুমে যেয়ে কুলায় না, বমি-পায়খানা করে দেয়। আমার ভাই সব পরিষ্কার করে। মাকে একা চাঁদপুর থেকে ঢাকায় নিয়ে কেমো দিয়ে আনা, সব করে।
আমি সবসময় বলি, পরিবার আমাদের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একচুলও ভুল বলি না। আমার দেখা যত সুপুরুষ আছে, সবার পরিবারও অমন।
আর আমাকে কেউ বোঝান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কি কোনো জেন্ডার থাকতে পারে? পাশের মানুষের জন্য মমত্ব দেখানোর জন্য আলাদা জেন্ডার লাগে?
'মা তো মা-ই' এই ননসেন্স কথাটা এসেছেই এই বাবাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা থেকে। অথচ একটি শিশু মা-বাবা দুজন থেকেই আসে।
অনেক কথা বলে ফেললাম। ক্ষমা করবেন।
তবে শেষে আরেকটি কথা বলি- আপনি যদি ছেলেসন্তানের প্যারেন্টস হোন, প্লিজ ওকে মানুষ বানান, পুরুষ নয়।