23/12/2025
দুই পবিত্র মসজিদের মার্বেলের শীতলতার পেছনের গল্প
হাজি ও ওমরাহ পালনকারীরা যখনই হারামের মাতাफ़ে পা রাখেন, তীব্র রোদের মধ্যেও মেঝের আশ্চর্যজনক শীতলতা অনুভব করে বিস্মিত হন। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—
এটি কি মার্বেলের স্বাভাবিক কোনো বৈশিষ্ট্য?
এর পেছনে কি বিশেষ কোনো প্রযুক্তি কাজ করছে?
নাকি মেঝের নিচে আছে কোনো কুলিং সিস্টেম?
এই বিস্ময়কর রহস্যের পেছনে রয়েছে এক প্রতিভাবান স্থপতির জীবনকথা—ড. মুহাম্মদ কামাল ইসমাইল এবং দুই পবিত্র মসজিদের মার্বেলের অনন্য যাত্রা।
স্থপতি: ড. মুহাম্মদ কামাল ইসমাইল
ড. মুহাম্মদ কামাল ইসমাইল জন্মগ্রহণ করেন ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯০৮ সালে, মিশরের দাকাহলিয়া জেলার মিত গামর শহরে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন এক বিস্ময়কর প্রতিভা।
তিনিই ছিলেন মক্কা ও মদিনার দুই পবিত্র মসজিদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থপতি।
মার্বেলের রহস্য (থাসোস মার্বেল)
ড. ইসমাইল চেয়েছিলেন হাজীদের জন্য হারামের মেঝে এমন মার্বেল দিয়ে ঢাকতে, যা তীব্র গরমেও ঠান্ডা থাকবে। তার খোঁজে তিনি বেছে নেন এক বিশেষ ধরনের মার্বেল—গ্রিসের থাসোস দ্বীপে পাওয়া “থাসোস মার্বেল”।
এই মার্বেলের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
অত্যন্ত উজ্জ্বল সাদা রং
অনন্য স্ফটিক গঠন
অত্যন্ত উচ্চ Albedo Effect, অর্থাৎ সূর্যের আলো ও তাপ অধিকাংশই প্রতিফলিত করে
তাপ খুব ধীরে শোষণ করে
এই কারণেই প্রচণ্ড রোদেও মার্বেলটি স্বাভাবিকভাবেই শীতল থাকে।
শীতলতা আরও বাড়ানোর জন্য মার্বেলের প্রতিটি খণ্ড ৫ সেন্টিমিটার পুরু করে বসানো হয়, যাতে তাপ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
👉 প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, মাতাफ़ের নিচে কোনো ঠান্ডা পানির পাইপ বা কুলিং সিস্টেম নেই—এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গুজব।
গ্রিস থেকে মার্বেল সংগ্রহ
ড. মুহাম্মদ কামাল ইসমাইল গ্রিসে যান এবং থাসোস দ্বীপের একটি ছোট পাহাড় থেকে খননকৃত মার্বেলের জন্য চুক্তি করেন।
এই চুক্তিতে তিনি সেই পাহাড়ের মোট মার্বেলের ঠিক অর্ধেক কিনে নেন।
মার্বেল সৌদি আরবে পৌঁছে এবং সফলভাবে হারামের মেঝে নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
১৫ বছর পর…
বহু বছর পরে সৌদি সরকার তাকে মদিনার মসজিদে নববী ﷺ-এর মেঝেতেও একই ধরনের মার্বেল বসানোর অনুরোধ জানায়।
ড. ইসমাইল স্মৃতিচারণ করে বলেন:
“যখন রাজকীয় দপ্তর আমাকে মসজিদে নববী ঢাকার কথা বলল, আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। এই মার্বেল পৃথিবীর আর কোথাও নেই, শুধু গ্রিসের ওই ছোট এলাকাতেই ছিল, আর আমি তো আগেই তার অর্ধেক কিনে নিয়েছি।”
তিনি আবার গ্রিসে যান এবং আগের কোম্পানির চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেন।
চেয়ারম্যান জানান:
“বাকি মার্বেলগুলো আপনার প্রথম ক্রয়ের পরপরই বিক্রি হয়ে গেছে।”
ড. ইসমাইল বলেন:
“জীবনে এত দুঃখ আমি আর কখনো অনুভব করিনি। কফিও শেষ করিনি, সেদিনই ফিরে যাওয়ার টিকিট কেটে ফেলি।”
অপ্রত্যাশিত মোড়
অফিস থেকে বের হওয়ার সময় তিনি সেক্রেটারিকে জিজ্ঞেস করেন:
“বাকি মার্বেলগুলো কে কিনেছিল?”
সেক্রেটারি বলেন:
“অনেক বছর হয়ে গেছে, খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।”
ড. ইসমাইল অনুরোধ করেন:
“আমার একদিন সময় আছে। অনুগ্রহ করে চেষ্টা করুন। এই আমার হোটেলের নম্বর।”
নিজেকে তিনি বললেন:
“এই তথ্য জানলে কীই বা হবে?”
তারপর মনে হলো—“হয়তো আল্লাহ কোনো পথ খুলে দেবেন।”
পরদিন, ফ্লাইটের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, ফোন এলো—
“আমরা ক্রেতার ঠিকানা পেয়েছি। দয়া করে অফিসে আসুন।”
ঠিকানা দেখে তার হৃদয় জোরে ধক করে ওঠে—
ক্রেতা ছিল একটি সৌদি কোম্পানি।
আল্লাহর পরিকল্পনা
তিনি সরাসরি সৌদি আরবে ফিরে যান এবং বিমানবন্দর থেকে সোজা সেই কোম্পানিতে যান।
চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞেস করেন:
“আপনারা গ্রিস থেকে কেনা সাদা মার্বেল দিয়ে কী করেছেন?”
চেয়ারম্যান বলেন:
“আমার মনে পড়ছে না।”
গুদামে ফোন করা হলো। উত্তর এলো:
“সমস্ত মার্বেল এখনো গুদামেই আছে, একদম অক্ষত।”
ড. ইসমাইল বলেন:
“আমি শিশুর মতো কেঁদে ফেললাম।”
কোম্পানির মালিক জিজ্ঞেস করলেন:
“আপনি কাঁদছেন কেন?”
ড. ইসমাইল পুরো ঘটনা খুলে বললেন এবং টেবিলে একটি ফাঁকা চেক রেখে বললেন:
“আপনি যা চান লিখুন।”
মালিক আল্লাহর কসম করে বললেন:
“যেদিন জানলাম এই মার্বেল মসজিদে নববীর জন্য, সেদিনই নিয়ত করেছি—এক দিরহামও নেব না। এই মার্বেল সম্পূর্ণ আল্লাহর পথে। আল্লাহই আমাকে এই মার্বেলের কথা ভুলিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে আজ এটি এই পবিত্র কাজে ব্যবহার হয়।”
উপসংহার
পবিত্র সেই পাহাড় সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ,
আর তিনিই একে সংরক্ষণ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা দয়া করুন
ইঞ্জিনিয়ার ড. মুহাম্মদ কামাল ইসমাইল-এর ওপর
এবং তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।
আমিন।