14/12/2025
বিগত সরকার নাকি ভারতের কথায় দেশের প্রতিরক্ষা খাত উন্নত করেনি, আকাশপথ নাকি দুর্বল রেখেছিল এইধরনের নানা গল্প শুনি নিয়মিত। ফেনীর বন্যায় 'লোকটি আসলেন আর চুপচাপ ১ হাজার কুটি অনুদান দিয়ে গেলেন' টাইপের নতুন গল্প শুনতেসি ইউরোফাইটার নিয়ে। গত দেড়বছরে বাহিনীর কোন দৃশ্যমান পরিবর্তন তো নেই, গদি যাওয়ার শেষ মুহুর্তে যুদ্ধ বিমান ক্রয় নিয়ে গলাবাজি আর ফাফরবাজিতে সয়লাব মিডিয়া।
যাইহোক, পুরাতন বা নতুন যেই বিমান ই আসুক দেশের জন্যইতো আসবে, আসলে আমরাও খুশি, আমাদের বাহিনী আপডেট হবে। কিন্তু সেটা আসার পর। কারণ এসব গালবাজি গত দেড় বছর দেখছি।
আর বাহিনীর জন্য বিগত সরকার কি করছে কি করেনাই এসব তথ্য যাচাই করতে গিয়ে দেখেছি দেশের বাহিনীতে যা আছে বর্তমানে, সব লীগ আমলেই করা। যেমন ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার 'ফোর্সেস গোল ২০৩০' নামে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
সে পরিকল্পনায় যা যা হয়েছে এবং হবে।
প্রথমে সেনাবাহিনীর কথা বলি:
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি সুপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত ও প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যা দেশকে প্রচলিত ও অপ্রচলিত হুমকির হাত থেকে রক্ষা করবে। এরপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার কার্যক্রমকে তিনটি স্বাধীন কোরে ভাগ করে - কেন্দ্রীয়, পূর্বাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয়। সর্বমোট পদাতিক ডিভিশনের সংখ্যা ১০টি করার জন্য তিনটি নতুন পদাতিক ডিভিশন,
সিলেটে ১৭ পদাতিক ডিভিশন,
কক্সবাজারের রামুতে ১০ পদাতিক ডিভিশন এবং বরিশাল-পটুয়াখালীতে ৭ পদাতিক ডিভিশন তৈরি করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইনেএকটি রিভারাইন ব্রিগেড (নদীভিত্তিক ব্রিগেড) তৈরি করা হচ্ছে। বান্দরবান জেলার রুমায় একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্টনমেন্ট প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। ২০২১ সাল পর্যন্ত ৯৭টি নতুন ইউনিট যোগ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৯টি ইউনিট সিলেট ক্যান্টনমেন্টে, ২২টি রামু ক্যান্টনমেন্টে এবং পটুয়াখালী জেলার লেবুখালী তে অবস্থিত শেখ হাসিনা ক্যান্টনমেন্টে ৫৬টি ইউনিট। কিছু নিয়মিত পদাতিক ব্যাটেলিয়নকে প্যারা ইনফ্যান্ট্রিব্যাটেলিয়ন এবং মেকানাইজড ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটেলিয়নে পরিণত করা হয়েছে। বিশেষ কার্যক্রম সক্ষমতা (স্পেশাল অপারেশন ক্যাপাবিলিটি) বৃদ্ধির জন্য ২ প্যারাকমান্ডো ব্যাটেলিয়ন গঠন করা হয়েছে। এই ব্যাটেলিয়ন ১ প্যারাকমান্ডো ব্যাটেলিয়নের সাথে মিলে একটি প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড হিসেবে গঠিত হয়েছে।
* সিলেটে ১৭ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা।
* কক্সবাজারে ১০ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা।
* বরিশালে ৭ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা।
* পদ্মা সেতুর পাশে ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা।
* পদাতিক বাহিনীকে ব্যলিস্টিক হেলমেট, কেভলার বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, নাইট ভিশন গগলস, আই প্রোটেক্টিভ গিয়ার, জিপিএস ডিভাইস, উন্নত যোগাযোগ যন্ত্র ও বিডি-০৮ অ্যাসল্ট রাইফেল দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছে।
* ৪৪টি এমবিটি ২০০০ ট্যাংক।
* ৫৪টি নোরা বি-৫২ কে-১ স্বয়ংক্রিয় কামান।
* ৭২টি ডব্লিউএস-২২ মাল্টিপল রকেট লঞ্চিং সিস্টেম।
* ১৮টি টিআরজি-৩০০ টাইগার মাল্টি-ক্যালিবার রকেট লঞ্চিং সিস্টেম।
* ১৮৮টি এল১০এ১ কামান।
* ৬৩৫টি বিটিআর-৮০ এপিসি।
* ৪৭টি অটোকার কোবরা-১ এলএভি।
* ৬৭টি অটোকার কোবরা-২ এমআরএপি।
* ৩ রেজিমেন্ট এফএম-৯০ স্বল্পপাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র।
* কিউডব্লিউ-২ কাধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র।
* এফএন-১৬ কাধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র।
* অরলিকন জিডিএফ-০০৯, ৩৫ মিমি (সুইজাল্যান্ড)- বিমান বিধ্বংসী কামান।
* মেটিস-এম১ ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র।
* পিফ-৯৮ ট্যাংক বিধ্বংসী রকেট।
* এসএলসি-২ ওয়েপন লোকেটিং রাডার।
* ২টি ইউরোকপ্টার এএস৩৬৫ ডাউফিন হেলিকপ্টার।
* ৬টি এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার।
* ১টি সি-২৯৫ডব্লিউ পরিবহন বিমান।
* ৩৬টি ব্রামোর সি৪আই মনুষ্যবিহীন আকাশযান।
* ১০০টি ট্রাই শার্ক স্পিড বোট।
* ১টি টাইপ সি কমান্ড ভেসেল।
সেনাবাহিনীতে কি করেনাই শেখ হাসিনা সরকার? একটা বাহিনীকে আধুনিক করতে ব্যাসিক যা দরকার সব করা হয়েছে। এই টার্ম ক্ষমতায় থাকলে আরো সর্বোচ্চ দামী ও আধুনিক অস্ত্র আনার কাজ শেষ হতো। সেটা আপাতত ইউনুস সরকারের কল্যাণে স্থগিত আছে।
এবার আসি নৌবাহিনীতে:
ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর পরিকল্পনা অনুযায়ী নৌবাহিনীকে একটি সুসজ্জিত ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী গঠনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। কক্সবাজারের পেকুয়াতে বানৌজা শেখ হাসিনা নামে একটি সাবমেরিন ঘাঁটি স্থাপন করছে। দেশের সর্ববৃহৎ নৌঘাঁটি নির্মিত হচ্ছে পটুয়াখালীর রাবনাবাদে , যার নাম দেয়া হয়েছে বানৌজা শের-ই-বাংলা। এই ঘাঁটিতে সাবমেরিনের নোঙ্গর ও বিমানচালন সুবিধা থাকবে। বানৌজা শেখ মুজিব নামে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ নৌঘাঁটি ঢাকার খিলক্ষেতে নির্মাণ করা হয়েছে যা ঢাকা নৌ-অঞ্চলের একমাত্র অপারেশনাল ঘাঁটি। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ চ্যানেলে একটি ফ্লিট হেডকোয়ার্টারের নির্মাণকাজ চলছে যেখানে জাহাজ নোঙ্গরের সুবিধা থাকবে।
এর পাশাপাশি:
* ২টি টাইপ ০৩৫জি সাবমেরিন। ২০১৭ সালের মার্চে নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়। যেগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে 'নবযাত্রা' ও 'জয়যাত্রা'
* ২টি টাইপ ০৫৩এইচ৩ ফ্রিগেট
* ২টি টাইপ ০৫৩এইচ২ ফ্রিগেট
* ২টি হ্যামিল্টন ক্লাস ফ্রিগেট
* ৪টি টাইপ ০৫৬ কর্ভেট
* ৪টি দুর্জয় ক্লাস লার্জ প্যাট্রল ভেসেল
* ৫টি পদ্মা ক্লাস প্যাট্রল ভেসেল
* ২টি তেলবাহী ট্যাংকার
* ২টি ডরনিয়ার ডিও-২২৮এনজি মেরিটাইম টহল বিমান
* ২টি এডব্লিউ-১০৯ হেলিকপ্টার
বিমানবাহিনী
ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানবাহিনীর বর্ধিষ্ণু দায়িত্বকে কার্যকরীভাবে পালন করার জন্য বাহিনীকে দুটি কমান্ডে বিভক্ত করা হচ্ছে: দক্ষিণাঞ্চলীয় এয়ার কমান্ড ও উত্তরাঞ্চলীয় এয়ার কমান্ড। ইতিমধ্যেই দুটো নতুন বিমান ঘাঁটি স্থাপিত হয়েছে - একটি কক্সবাজারে এবং অন্যটি ঢাকার বঙ্গবন্ধু বিমান ঘাঁটি।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের অধীনে বরিশালে একটি নতুন বিমান ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। কক্সবাজার বিমান ঘাঁটির আধুনিকায়নকরা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডে একটি মেরিটাইম এয়ার সাপোর্ট অপারেশন সেন্টার (MASOC) গঠন করা হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলীয় এয়ার কমান্ড এর অধীনে সিলেটে আরেকটি বিমানঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে।
বিমান বাহিনী ১০৫ এডভান্স জেট ট্রেইনিং ইউনিট নামে একটি বিশেষায়িত যুদ্ধবিমান পাইলট প্রশিক্ষণ ইউনিট তৈরি করছে। এই ইউনিটে তিনটি প্রশিক্ষণ স্কোয়াড্রন থাকবে যা পাইলটদেরকে যুদ্ধবিমান চালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান করবে।
আরো যা যুক্ত করা হয়েছে:
* ১৬টি এফ-৭ যুদ্ধবিমান
* ১৬টি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান
* ১৬টি জেএল-৮ প্রশিক্ষণ বিমান
* ২৩টি পিটি-৬ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ বিমান
* ৩টি 'এল-৪১০ পরিবহন প্রশিক্ষণ বিমান
* ১৬টি এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার
* ২টি এডব্লিউ-১৩৯ হেলিকপ্টার
* ২টি এডব্লিউ-১১৯কেএক্স প্রশিক্ষণ হেলিকপ্টার
* ২ রেজিমেন্ট এফএম-৯০ স্বল্প পাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র
* জেএইচ-১৬ রাডার
* জেওয়াই-১১বি রাডার
* ওয়াইএলসি-২ রাডার
* ওয়াইএলসি-৬ রাডার
* সেলেক্স আরএটি-৩১ডি রাডার
MIG-29 ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৮ সালে রাশিয়া থেকে ক্রয় করেছিল।
সমরাস্ত্র কারখানা
* বিডি-০৮ অ্যাসল্ট রাইফেল প্রস্তুতকরণ
* বিডি-০৮ লাইট মেশিন গান প্রস্তুতকরণ
* আর্জেস এইচজি-৮৪ গ্রেনেড তৈরি
* কামান ও মর্টারের শেল তৈরি
* এফএন-১৬ ঈগল ম্যানপ্যাড
পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা সহ দেশের প্রতিরক্ষার স্বার্থে লীগ আমলে যা হয়েছে যতটুকু হয়েছে তা বিগত কোন সরকার করতে পারেনি। এখন ইউরোফাইটারের আলোচনা হচ্ছে। আসলে অবশ্যই এপ্রিশিয়েট করবো। কিন্তু গলাবাজিকে নয়। গত দেড়বছর গলাবাজি হয়েছে, 'এই যে দেখুন লোকটা কি করলো, লোকটাকে থামান, লোকটাকে আটকান' এগুলোই।
সর্বোপরি চাই দেশ ভালো থাকুক। দেশ এগিয়ে যাক। আমাদের যে অগ্রযাত্রা ছিলো সেখানেই আমরা ফিরে যেতে চাই।